সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৮

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৮



‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️


চমকে উঠলো আফিয়া।কি ছিলো নাসিফের গলায় জানা নেই।তবে মনে হচ্ছে রেগে যাচ্ছে।আফিয়া যথেষ্ট পরিপক্ক একজন নারী,বয়স আর মগজ দুটোই তার ঠিকঠাক স্থানে আছে।তবুও কেন জানি সে এই মুহূর্তে বেশ অস্বস্তি বোধ করছে তার চেয়েও বেশি নার্ভাস হচ্ছে অথচ এটা নুন পান্তা ভাতের মতোই তার কাছে ।নাসিফ ভ্রু কুঁচকে তাকালো,আফিয়া এলোমেলো চিত্তে লম্বা কদমে চেয়ারে এসে বসলো। পাশাপাশি দু'টো চেয়ার,মাঝে দুরত্ব দুই চেয়ারে সমপরিমাণ জায়গা।নাসিফ‌ই  কথা বাড়ালো,

“ আমার পরিবারকে পছন্দ হয়েছে?"

সবসময় পাত্র জিজ্ঞেস করে পাত্রীর কি গুন আছে কি গুন নাই। কোনটা ভালো লাগে কোনটা লাগে না কিংবা তাকে কেমন লাগছে?অথচ এ প্রশ্ন সবার চেয়ে আলাদা।আফিয়ার নার্ভাসনেস আর‌ও বেড়ে গেল।কারণ অতি ভালো মানেই সমস্যা,এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী আফিয়া গাজী পরিবারের সবার অতি ভালো মানুষিতে বেশ চিন্তিত। কোথাও তার কাছে বিশাল খটকা লাগছে।নাসিফ উত্তর পাওয়ার আগেই বললো,

“ আপনাকে আমার পরিবার পছন্দ করছে, নিশ্চিত আমার ছেলেও নয়তো আপনি এখানে আমার সামনে বসে থাকতেন না।"

আফিয়া এত সময়ে চোখ তুলে তাকালো,কথার মানে বুঝতে পারেনি। পরিবারের কথা বুঝছে কিন্তু ছেলে।নাসিফের দৃষ্টি তখন দূরে লাগানো নতুন গজানো মিষ্টি কুমড়ার ফুলে,সে আফিয়ার মুখ তুলে তার দিকে তাকানো অনুমান করেই পরের কথাটা বললো,

“ আমার ছেলে মেয়ের পছন্দ হলেই সবার চলবে। এখানে তাদের সিদ্ধান্ত‌ই চুড়ান্ত।কারণ আপনাকে আজীবন তাদের হয়েই থাকতে হবে। মানে...

নাসিফ মুখ ঘুরালো।আফিয়ার চোখে প্রশ্ন নেই।কেমন অনুভূতিহীন লাগছে। একদমই ফ্যাকাসে সেই চাহনি। কোথাও বিন্দুমাত্র রঙের ঝলক নেই। অথচ এই চোখে কাজল পড়লে কি নিদারুন সুন্দর‌ই লাগতো, আচ্ছা চোখটা এমন ফ্যাকাসে কেন? কাজলের অভাবে নাকি অন্য কিছু? অবশ্যই অন্য কিছু,যে নারীর জীবনে এত বেদনা তার চোখে রঙ কি করে থাকবে? তাতো বরষায় ভেসে যায় বেদনার নোনাজল হয়ে। কিন্তু তাতে নাসিফের কি? সে তো তার শর্ত মানলেই এই বিয়েতে মত দিবে নয়তো না।

“ আমার বাচ্চাদের জন্য মা দরকার, যেই মা নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার সন্তানদের আগলে রাখবে।যার কাছে তার নিজের চেয়েও আমার সন্তানের মূল্য বেশি থাকবে!"

আফিয়া এখনও চুপ, কিন্তু নাসিফ বলছে,

“ আমার বাচ্চারা মায়ের অভাবে ভুগছে,তাই আমি বিয়েতে মত দিয়েছি তার মানে পরিষ্কার আমার বাচ্চাদের মা নেওয়ার জন্য‌ই আমি দ্বিতীয় বিয়ে নামক শব্দে নিজেকে জড়াচ্ছি,হ্যা তাই বলে এই নয় যে আমার স্ত্রী দরকার নেই। অবশ্যই দরকার আছে! আমি একজন সুস্থ সবল পুরুষ, আমার সব রকমের চাহিদা আছে। প্রয়োজন আছে, বিশেষ মুহূর্তে একজন মানুষ দরকার যার কাছে নিজেকে মেলে ধরা যায় অবলিলায়। দরকার একজন প্রকৃত সঙ্গিনীর যার সাথে নিজের সুখদুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায়। অসুস্থতার দিনে যার উপর ভরসা করে বাঁচার স্বপ্ন দেখা যায়।যে পরম যতনে আমাকে আগলে রাখবে। একজন সঙ্গিনীর আসলেই দরকার কিন্তু?"

এই মুহুর্তে থামলো নাসিফ।আফিয়া প্রশ্নাত্নক চোখে 

তাকালো এবার।এখন তারা চোখেমুখে কৌতুহল ভাসছে,

“ শুধু এগুলো চাইলে আমি যেকোন মেয়েকেই বিয়ে করতে পারি, তার জন্য নিশ্চয়ই আমাকে এত কষ্ট করে বিশেষ কাউকে চয়েস করতে হতো না!"

‘ বিশেষ ' শব্দটি আসলেই বিশেষ হয়ে গেলো তাই আফিয়াও এবার মুখ খুললো,

“ মানে?"

“ মানে পরিষ্কার,আমি এবং আমার পরিবার সকলেই চেয়েছি এমন কাউকে যার কাছে আমার বাচ্চারা নিরাপদ,যার কাছে তারা সৎ নয় নিজের বলে পরিচিত হবে।"

“ আমি যে এমন কেউ হবো তা কিভাবে ধরে নিলেন!"

“ ধরে নেইনি তো! ধারনা করছি!"

“ ওহ আচ্ছা, তারপর?"

আফিয়ার প্রশ্নের ধরন বেশ ত্যাড়া ছিলো।নাসিফ ডান ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো, কিন্তু তাতে আফিয়ার কোন হেলদোল হলো না।সে এক‌ই ভাবে চেয়ে আছে নাসিফের দিকে।

“ আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি না।তাই নিজেও কখনো বলি না। সোজাসাপ্টা ভাবেই বলছি,আমার নিজের জন্য স্ত্রী দরকার মাত্র ১০ ভাগ বাকী ৯০ ভাগ দরকার বাচ্চাদের মা হিসেবে! তাই আমি এমন কাউকে খুঁজছি যার কখনো সন্তান হবে না সহজ বাংলায় যাকে বলে বাজা, বন্ধ্যা!কারণ বিবেচনা করলে একজন বন্ধ্যা নারী‌ই কেবল বুঝে সন্তানের দরদ। নিজের সন্তান যখন থাকে না তখন তারা অবশ্যই অন্যের সন্তানকে আপন করতে পারে।তার চেয়েও বড় কথা সে বন্ধ্যা বলে কখনো‌ই সন্তান জন্ম দিতে পারবে না সেক্ষেত্রে আমার বাচ্চাদের জীবনেও কোন প্রতিযোগীতা আসবে না। আসবে না আপন পরের দ্বন্ধ!তারা ঐ নারীকে মা বলে জানবে যে তাদের আগলে রেখে নিজের জীবন উৎসর্গ করবে!"

আফিয়া নির্বাক হয়ে শুনছে সামনে দাঁড়ানো অতি সুদর্শন কিন্তু কাঠখোট্টা এই পুরুষের তেতো কথাগুলো।কথায় কথায় বন্ধ্যা বলে সম্বোধন করছে, বোঝাচ্ছে বন্ধ্যা নারীর অক্ষমতা কি কি। কিন্তু সে কি জানে এই একটা শব্দ একটা নারীর জীবনের কত বড় অভিশাপ!

নাসিফ‌ পূনরায় বললো,

“ আপনাকে আজ দেখতে আসার এটাই একমাত্র কারণ।এখন বলুন আপনার কি মতামত?তবে হ্যা মতামত যাই দিবেন তা কিন্তু আমৃত্যু টিকিয়ে রাখতে হবে,যদি মনে করেন এখন বিয়েটা করার জন্য একটি বললেন এবং ভবিষ্যতে গিয়ে সেটা পাল্টে ফেললেন তাহলে চুড়ান্ত ভুল করবেন,আমি আমার বাচ্চাদের কল্যানে একটা কেন, একশো স্ত্রী ত্যাগ করতে‌ও দ্বিতীয়বার ভাববো না।"

“ যদি কখনো মিরাক্কেল ঘটে?"

“ মানে?"

আফনূরের কথায় প্রশ্ন করলো নাসিফ, আফনূর ঠোঁটে হালকা বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে বললো,

“ হতেও তো পারে আল্লাহ খুশি হয়ে কখনো তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন যেটাতে মানুষের কোন হাত নেই।তখন কি করবেন আপনি? মানে আপনি চাইছেন না আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী যে হবে তার কখনো বাচ্চা হোক,বা এক কথায় আপনি এই কারণেই বন্ধ্যা অথবা বাজা কোন নারীকে খুঁজছেন,তো ধরেন বিয়ের পর হঠাৎ করেই আল্লাহ তার প্রতি খুশি হয়ে একটি সন্তান দিয়েই দিলো তখন?"

“ অসম্ভব?"

মৃদু চিৎকার করে উঠলো নাসিফ।আফিয়া চমকে উঠলো নাসিফের এমন ব্যবহারে।

নাসিফের ফর্সা চেহারা লাল হয়ে উঠেছে,সে কোন মতে নিজেকে সামলে বললো,

“ এমন কিছু ভুলেও আমি একসেপ্ট করবো না। তার জন্য যদি ঐ স্ত্রীকে ত্যাগ করতে হয় তবে আমি তাই করবো! তবুও আমি আমার বর্তমান সন্তানদের জীবনে সৎ ভাই-বোন নামক শব্দকে ঢুকতে দিবো না। আমার আর কোন সন্তান দরকার নাই। আল্লাহ দুটো দিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ আমি তাতেই খুশি!"

নাসিফের ব্যবহারে হতভম্ব হয়ে গেলো আফিয়া। সন্তানের জন্য বাবারা চিন্তিত হয় ঠিক আছে,তারা মায়ের অনুপস্থিতিতে তাদের বাচ্চাদের ভালোর জন্য সর্বোচ্চ করে তাও ঠিক আছে তাই বলে কেউ এমন পাগলামি করে!

নাসিফ নিজের ব্যবহারের অবস্থান বুঝলো। কোনমতে শান্ত হয়ে শান্ত কন্ঠেই বললো,

“ হেয়ালি বাদ,আপনি ভেবে চিন্তে বলুন, আপনি আমার প্রস্তাবে রাজী কি-না? যদি হোন তবে ..”

থামলো নাসিফ,আফিয়ার কৌতুহল বাড়লো। চোখেমুখে প্রশ্নরা খেলছে,

নাসিফ একটু ঘরে দাঁড়ালো মিনিট দুই কি পাঁচের মতো হয়তো বাকী আছে আজান পড়ার,দু হাতের তালুতে মুখটা ঢললো।আফিয়া দেখছে এক অতি আবেগী, দুঃশ্চিন্তিত আর পিতাকে।যে কি-না নিজের মাতৃহীন সন্তানের জন্য কতটা উদগ্রীব হয়ে এমন আবোলতাবোল বকছে।

“ আপনার মেডিক্যাল ডকুমেন্ট কোথায়?"

“ মানে?"

“ মানে আপনি তো নিয়মিত চেকাপে আছেন,সো অবশ্যই আপনার মেডিক্যাল ডকুমেন্ট আছে! সেগুলো আমি একটু দেখবো!"

“ কেন?"

“ সমস্যা কোথায়,দেখি! এরপর না হয় সিদ্ধান্তে আসা গেল!"

“ আপনার মনে হচ্ছে না আপনি আমাকে অপমান করছেন?"

আফিয়ার এই কথাটায় একটু থমকালো নাসিফ।হ্যা সে একটু বেশি বেশিই করছে। এটা ঠিক না কিন্তু তার কি করার আছে? সে যথেষ্ট চিন্তিত তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই একটু বাড়াবাড়ি করলেও সমস্যা নাই।

“ আমার জায়গায় থাকলে বুঝতেন কি যাচ্ছে এই মুহূর্তে আমার উপর দিয়ে!"

“ সেইম টু ইয়্যু!"

বললো আফিয়া।নাসিফ শান্ত গলায় বললো,

“ আপনাকে জোর করছি না। তবে আমার শর্ত এটাই! আগে আপনার মেডিক্যাল রিপোর্ট দেখবো এরপর ভাববো আসলেই আপনাকে বিয়ে করা যায় কি-না?"

“ আমার মেডিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী আমি সন্তান ধারণে সক্ষম মাত্র টু পার্সেন্ট; আর...

“ মুখে নয়।কাগজ দেখান!"

আফিয়া অতি আত্নসম্মানবোধ সম্পন্ন হলেও এই মুহূর্তে কেন জানি নাসিফের সাথে তর্কে যেতে ইচ্ছে করছে না।হয়তো নিজের ভাগ্য দেখে আজ তার নিজের‌ই বিদ্রুপের হাসি আসছে।আজ যদি সে এই বিয়েতে রাজী না হয় তবে তাকে অবশ্যই সাফিয়ার ননদাইয়ের সাথে বিয়েতে মত দিতে হবে। কিন্তু তা আফিয়া চায় না। সন্তানের জন্য পাগলকে বিয়ে করা উত্তম দুঃশ্চরিত্রের চেয়ে।

“ এখন‌ই দেখবেন, নাকি ইফতারের পর!"

হঠাৎ করেই আফিয়ার কন্ঠে কোমলতা চলে আসলো।নাসিফ থমকালো, এত সময় আফিয়ার কন্ঠে তেজ ছিলো অথচ এখন কেমন নরম শোনাচ্ছে যেন সে কত অসহায় হয়ে বলছে!

“ আযান পড়ে যাবে। ইফতারের পর'‌ই দেখি!"

“ ঠিক আছে!"

এই ছিলো দুজনের বিয়ের পূর্ব মুহূর্তের বাতচিত। দরজায় কান পেতে থাকা রমনীরা হতাশ হলো। ভেবেছিল কি আর হয়ে গেল কি? এখানেও হবে না বিয়েটা।আগ হয়নি বাচ্চা হবে না দেখে এখন এখানে কি একটা গোঁ ধরে বসে রয়েছে ঐ লোক।

“ এত ভাবার কিছু নাই , দুই পার্সেন্টে বাচ্চা হয় না।সো রিল্যাক্স!"

বললো সাফিয়া, সিনথিয়া বিরক্ত হচ্ছে সাফিয়ার এমন কটুক্তি সম্পন্ন কথাতে। কিন্তু তর্ক করতে চাইছে না তাই কোন উত্তর‌ও দিচ্ছে না।

বাবার দরজা দিয়েই দু'জনে ঘরে ঢুকলো।

মুরব্বিরা মুখিয়ে আছে তাদের সিদ্ধান্ত জানার জন্য। এদিকে নাসিফের এই শর্ত জানে কেবল তার মা একা,সেও ভীষণ উদগ্রীব হয়ে আছে সবটা জানার জন্য।আফিয়ার মুখোভঙ্গি স্বাভাবিক,তাকে দেখেও কিছু বোঝা যাচ্ছে না।নাসিফ বাবার পাশে এসে বসলো,আফিয়া নিজের বাবার পাশেই বসে থাকলো।

“ কথা হয়েছে,কেমন লাগলো তোমার,সব ঠিকঠাক লেগেছে?"

নাসিফের কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো আরিফ,নাসিফ বিশেষ কোন উত্তর করলো না,তার চোখেও কিছু বোঝা যাচ্ছে না।তবে আরিফ জানে নিশ্চিত কিছু এমন হচ্ছে যা নাসিফ নিয়ন্ত্রণ করছে।

সেলিমের চোখে মুখেও দুঃশ্চিন্তায় ভাজ পড়েছে,আদরের ভাগ্নির এমন ভাগ্যে সে সবসময় আফসোস করে যাচ্ছে। অন্তত এই, এখানে ভালো কিছু ঘটবে বলেই আশাবাদী কিন্তু পাত্রের মুখে কুলুপ আঁটা দেখে ভীত হয়ে পড়ছে।

“ আচ্ছা আযান পড়ে যাবে,এখন সবাই ইফতারের জন্য প্রস্তুত হোন,দোয়ায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন চলেন!"

বললেন ইমাম সাহেব।ঠিক একটু পরেই আযান পড়লো।মেয়েরা সব এক জায়গায় করবে দেখে মিষ্টি গিয়ে আফিয়াকে আনতে গেলে আফিয়া জানালো সে তার বাবার সাথেই করবে।তার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে সালমা ফাওযিয়া বললেন যা যা আছে সবকিছুই ওকে ঐ ঘরে দিয়ে আসতে। সুলতানা আযিযাহ সালমা ফাওযিয়ার ব্যবহারে মুগ্ধ হচ্ছেন।তিনি এখন মনে প্রানে চাচ্ছেন মেয়েটার সম্বন্ধ যেন এখানেই ঠিক হয়ে যায়।

ইফতারি শেষে পুরুষলোক মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করলো আর মহিলাগন ঘরেই।

মেডিক্যাল তথ্য অনুযায়ী আফিয়ার নানারকম শারীরিক জটিলতা আছে,যেটা কাটিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া একরকম অসম্ভব। সবচেয়ে বেশি সমস্যা ওভারিতে, থাইরয়েডের সমস্যা প্রকট।সব কাগজপত্র সহ ফাইলটা হাতে নিয়ে পড়ছে আর আড়চোখে এক উদাসী নারীকে পর্যবেক্ষণ করছে।নাসিফ জানে সে যা করেছে তা অন্যায়,ভুল। কোনমতেই সে একজন নারীর এমন ইমোশন নিয়ে এত জঘন্য ভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করা উচিত নয়।তবুও সে করছে। নিজের সন্তানদের জন্য করছে।হলে হোক অন্যায়,হোক অপরাধ! বাবা হয়ে কোনভাবেই সে কোন রিস্ক নিতে পারবে না।তাই সে বিবেককে বিসর্জন দিয়ে স্বার্থপর, জঘন্য মানবের মতোই করবে। 

“ আপনার মেডিক্যাল তথ্য অনুযায়ী আপনি সন্তান জন্ম দিতে পারবেন মাত্র দুই শতাংশ,এমন কি সেই সন্তানের জীবন‌ও অনিশ্চিত অর্থাৎ যদিও কখনো গর্ভধারণ করেন তাহলে গর্ভেই সেই সন্তানের মৃত্যু নিশ্চিত সাথে আপনার জীবন‌ও রিস্কে থাকবে!"

নাসিফের বিবৃতিতে ফিরে তাকালো আফিয়া। ইফতারের পর মুরব্বিরা উভয়কেই জিজ্ঞেস করেছিলো তাদের মতামত,আফিয়া বলেছিলো সময় দাও,আর নাসিফ বলেছিলো আরো একটু কথা বলে দেখতে চাইছে। তারপর আর কোন কথা কেউ বলে নাই তবে উভয় পরিবারের সদস্যদের মাঝেই চলছে উত্তেজনা।

“ এখন আপনার মতামত কি তা দয়া করে সবাইকে জানিয়ে দিবেন,আমি এত মানুষের এত চিন্তা নিতে পারছি না!"

বললো আফিয়া। নাসিফ ফাইলটা বন্ধ করে বেশ কিছু সময় চুপ থেকে দূর আকাশের একা ভেসে চলা চাদটাকে দেখলো।আজ ভরা পূর্ণিমা। চারদিকে জোৎস্না উছলে পড়ছে,তার আলোয় আফিয়ার উদাসী ঐ চোখটা কেন জানি বড্ড ভালো লাগছে,খুব টানছে আফিয়ার ঐ আঁখি দুটো কিন্তু কোথাও যে খুব একটা আঁটকে যাচ্ছে। ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়লো নাসিফ, এরপর বললো,

“ যদি আমি বিয়েটা করি!"

আফিয়া নাসিফের দিকে গভীরভাবে চাইলো, এরপর শুধালো,

“ কিন্তু? রিপোর্ট দেখার পরেও!"

“ হ্যা; তবে শর্ত আগের টাই! আপনি কখনোই সন্তান নিতে পারবেন না। আমার চাই না।!"

আফিয়া স্তব্ধ হয়ে গেলো মুহূর্ত খানিকের জন্য এরপর নিরবতা বিচ্ছিন্ন করে বললো,

“ যদি আপনার শর্তে রাজী না হ‌ই?"

“ তাহলে কথা এখানেই শেষ!"

আবার দু তরফা নিরবতা,সেই নিরবতায় শব্দ তুললো আফিয়াই,

“ আমি রাজী তবে আমার‌ও একটি শর্ত আছে! যদি সেটা মানতে রাজি হোন তবে আমি আপনার সব শর্তে রাজী।"

নাসিফ এমন কথার জন্য প্রস্তুত ছিলো না তাও প্রবল বিশ্বাস নিয়ে বললো,

“ ওকে বলুন  আপনার শর্তটি!"

“ আমি বিয়ের পর‌ও চাকরি করতে চাই,আমার পরিবারের অবস্থা তো দেখছেন‌ই ।আমি তাদের দায়িত্ব ছাড়তে পারবো না।তাই যদি আপনার মনে হয় আপনি আমাকে সেই সুযোগ দিবেন তাহলে?"

“ আপনি চাকরি করলে আমার বাচ্চাদের দেখভাল কে করবে? আমি বাচ্চাদের জন্য আপনাকে বিয়ে করছি তো আপনি‌ই যদি সকাল থেকে রাত অবধি ঘরের বাইরেই থাকেন তাহলে বাচ্চারা মায়ের ভালোবাসা পাবে কিভাবে?”

নাসিফের কথায় যুক্তি আছে তাই আফিয়ার তরফ থেকে নিজের জন্য কোন সাফাই এলো না।নাসিফ‌ই বলতে থাকলো,

“ এত কথা বুঝি না।আমি শুধু বলতে চাই আমি আপনার সব দায়িত্ব নিবো,তার বিনিময়ে একটাই চাওয়া আমার সন্তানদের মা হয়ে যান। আর কোন সন্তান জন্ম দেওয়ার দরকার নেই এমনিতেই আপনার নিজের জীবন‌ই তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"

“ আপনি আমার দায়িত্ব নিবেন মানে? বিয়ের পর এমনিতেই একজন স্ত্রীর দায়িত্ব তার স্বামীর সেখানে তা এত ফলাও করে বলার কি আছে?"

“ স্ত্রী হিসেবে আপনার দায়িত্ব আমার অবশ্যই, কিন্তু আমি আপনার কাঁধে থাকা আপনার পরিবারের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছি! আমি জানি আপনি বিয়ে না করার প্রধান এবং একমাত্র কারণ‌ই হচ্ছে আপনার পরিবারের বর্তমান অবস্থা।বাকী সব তো বাহনা কেবল!"

আফিয়া এই কথায় লজ্জিত হয়ে মাথা নত করে ফেললো। নিজেদের দুর্দশা কাউকে দেখাতে চায় না সে কিন্তু তা কি কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখা যায়!

“ এমন কিছু নয়।সবটা যা দেখা যাচ্ছে তাই, এখানে কোন লুকোচুরি নেই!"

“ ওকে,আই এগ্রি।বাট আপনার উত্তর?"

নিজের চালাকি ধরা পড়ে যাওয়ায় লজ্জা পেলো আফিয়া।চোখটা নামিয়ে অন্যদিকে ফিরে দাঁড়ালো।নাসিফ একটু হাসলো।পরেই বললো,

“ চলেন ভেতরে যাই সবাইকে গিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেই।"

নাসিফ আগে আগে গেলো সাথে গেলো আফিয়া। দরজার কাছে গিয়েই নাসিফ ডাকলো,

“ আফিয়া!"

পা থেমে গেলো আফিয়ার। আজ এত সময়ের আলাপে একবারও নাসিফ তাকে নাম ধরে ডাকেনি।আর এখন যখন ডাকলো তখন সে কি দরদ ছিলো তার কন্ঠে! কতটা আদর করে ডাকলো। সচরাচর আফিয়াকে সবাই আফি বলেই ডাকে কেবল মা আর বাবা'ই তাকে আফিয়া বলে ডাকে অবশ্য আরও একজন‌ও ডাকতো। 

নাসিফ আবারও ডাকলো,

“ আফিয়া শোন!"

“ জ্বী।”

চমকে গিয়ে প্রত্যুত্তর করলো,নাসিফ কাছাকাছি এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ আচ্ছা বিয়ের আগেই অবিবাহিত অবস্থায়‌ই আপনার এই পরীক্ষার দরকার কি ছিলো?"

নাসিফের এই প্রশ্নে আফিয়ার মুখটা শুকিয়ে গেল।কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল একটু আগের উচ্ছল বদনটা।নাসিফের চোখমুখে প্রশ্নেরা দোল খেলছে,আফিয়া ইতস্তত করতে থাকলো।নাসিফ‌ বুঝে নিলো আফিয়ার সংকোচের কারণ হয়তো।তাই বললো,

“ যখন মনে হবে বলা যায় বলবেন,আমি অপেক্ষায় থাকলাম।তবে তাড়াহুড়ো নেই কোন। চলুন ভেতরে!"

“ হু!"

চলবে??

জানাতে ভুলবেন না কেমন হচ্ছে?

হ্যাপি রিডিং ডিয়ার রিডার্স 😚

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ