সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৪২

#সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৪২

সুখ প্রান্তর মরিয়ম বিবি


কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ‼️ 


 আফিয়া ঘুমন্ত ছেলেকে বুকের উপর চেপে ধরেই ঘর থেকে বের হলো।ছেলেটা মাশাআল্লাহ স্বাস্থ্যগত ভাবে বেশ নাদুসনুদুস হচ্ছে। এভাবে বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে কষ্ট হয় তাও মা'তো মা‌'ই। সব স‌ওয়ার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে তাদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়।নাবীহা মায়ের বোরকার কোনা খামচে ধরে রেখেছে। চারদিকে এত মানুষ! সে একটু ভীত হচ্ছে। ঐদিকে নানী এখনো কাঁদছে।খালামনি কাঁদছে।সে অনেকক্ষণ খালা মনির কাছেই বসে ছিলো।খালা মনি নতুন বাবু আনবে তাতেও সে অনেক খুশি।খালা মনিকে বলেছে এবার যেন তার জন্য একটা বনুই আনে।খালামনিও মায়ের মতো করেই বলেছে আল্লাহর কাছে চাইতে।

নাবীহা চেয়েছে।

ভাগ্নিকে বুকে চেপে হাহাকার করে কেঁদেছে সাফিয়া।তার চোখে ভাসছে নাবীহা আসলে তার বাবার মুখটা কত জ্বলজ্বল করতো।কি ভীষন আদর করতো তার বাবা বাচ্চা দুটোকে। নিজের পাশে বসিয়ে কত রসিকতা করতো।নাবীহার বিয়ে দিবে বলেও দুষ্টুমি করতো।আবার তিনি‌ই ছোট ব‌উ করে ঘরে রেখে দিবে বলে নাবীহাকে ক্ষেপাতো।

সাফিয়ার বুকে হঠাৎ করেই খামচে ধরলো না পাওয়ার এক অদৃশ্য হাহাকার।তার সন্তান তো পেলো না নানার আদর,স্নেহ, ভালোবাসা! তার ভাইয়ের বাচ্চারাও পাবে না দাদার আদর।বড় আপার অন্তত একজনতো পেলো। ইস্ এই না পাওয়ার যন্ত্রনা তাকে ভীষণ পোড়াবে। ভীষণ ভাবে দগ্ধ করবে!

খালামনির কান্না দেখে নাবীহা ভয় পেয়ে যায়,সেও চিৎকার করে কান্না করে। এরপর মামী কাউকেই থামাতে না পেরে নাবীহাকে কোলে করে আফিয়ার কাছে দিয়ে যায়।আফিয়া মেয়েকে অনেক কষ্ট করে থামায়।


“ আপা বাবুকে আমার কাছে দাও!"


মিষ্টি এগিয়ে এসে আফিয়ার থেকে তাইফকে নিতে চায়।আফিয়া অসম্মতি দেখিয়ে বলে,


“ না, থাক ও আমার কাছে।

_ তুই কি যাবি আমাদের সাথে?"


“ না আপু।আমি এখানেই থাকবো মায়ের সাথে।"


যেহেতু মরা বাড়ি তাই খালি ঘর রাখা যাবে না। অন্তত চল্লিশ দিন অবধি এই ঘরের চারদিকে মৃত মানুষের রুহ ঘুরাফেরা করবে তাই ঘর অন্ধকার করে রাখা যাবে না। সন্ধ্যায় আগরবাতি জ্বালাতে হবে,গোলাপ জল ছিটাতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে সুতরাং একজন মানুষ থাকা একান্ত জরুরী।যদিও আফিয়ারা তিন দিনের মিলাদ দিয়েই ফিরে আসবে তবুও। আপাতত এখানে ঘর পাহারায় থাকবে মামী আর মিষ্টি। মোটামুটি বাকী সবাই যাবে লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে।


সাফিয়াকে রেজ‌ওয়ান হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসলো। ভারী শরীর তার মধ্যে আগাগোড়া কালো বোরকায় ঢাকা।সাফিয়ার গর্ভকালীন সময়ে শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে তাই তাকে ইনহেলার দেওয়া হয়েছে।সেটা সে সবসময় কাছেই রাখে।


নাসিফ গাড়ী বের করে সবার অপেক্ষায় র‌ইলো। আগপিছ করে দুটো গাড়ী দাড় করানো।

ঘর থেকে বেরিয়েই সাফিয়া বড় বোনকে জিজ্ঞেস করলো,


“ তুমি কি ভাইয়ার সাথে যাবে?"


“ না,সবার সাথেই যাবো।"


বলেই আফিয়া আগেই এগিয়ে গেল।নাবীহা মায়ের আগেই দৌড়ে বাবার কাছে গেছে।সে গাড়ীতে উঠে বসেছে। অপেক্ষা নানু,খালা মনি আর মায়ের আসার। কিন্তু তার আশাতে গুড়েবালি ঢেলে দিয়ে আফিয়া গিয়ে মাইক্রোতে উঠলো।তার ব্যাগটা নিয়ে রেজ‌ওয়ান পিছনের দিকে রাখলো।সেলিম মামা,বশির ভাই, সিনথিয়া আপা,মান্নাতের, বাবা,মা,

মাঈন,সহ আফিয়ার আরো কয়েকজন আত্নীয় নিয়ে মোট পনেরো জনের যাত্রী এই এক গাড়িতে উঠলো।নাসিফ গাড়ির পাশেই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলো।তাকে পাশ কেটে আফিয়া ঐ গাড়িতে গিয়ে উঠেছে। এবং তার পুরো পরিবার।লাশের গাড়িতে থাকবে সালাহ্।তার সাথে জেদ ধরে বসেছে নাইফ। সালাহ্ ভাগ্নেকে অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু নাইফের জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়ে অবশেষে নিজের সাথেই তুলে নেয়।যদিও অনেক কষ্ট হবে, চালকের পাশে গাদাগাদি করে চালকের সহযোগী আর তাদের বসতে হচ্ছে।তাও বাচ্চাটা বেশ খুশি হচ্ছে এতেই অনেক।বাবার আদেশ সালাহ্ সবসময় মনে রাখবে।এই বাচ্চা দুটোকে নিজের আপন ভাগ্নে ভাগ্নির মতোই যতনে আদরে রাখতে বলেছে। সালাহ্ তাই করবে। সবচেয়ে বড় কথা ওরা দুই ভাই বোন এত বেশি কোল ঘেঁষা যে ওদের কখনো দূরে রাখাই যায় না। সালাহ্ কেন ওদের পরিবারের কেউ পারে নাই।এই যে ওদের জন্য এই বাড়ির মেয়েকে এত কষ্টের শিকার হতে হচ্ছে তাও ওদের প্রতি কারো বিন্দুমাত্র রাগ কিংবা ক্ষোভ কাজ করে নাই।করেও না।


মামার কোলে চেপে বসেছে বারো বছরের সুঠামদেহী নাইফ।মামা তার আদর্শ।মামার সাথে কোন মুহূর্ত সে কামাই করতে চায় না।মামার সব এক্টিভিটিস তার চরম ভালো লাগে।সে সবসময় ভাবে বড় হয়ে মামার মতো হবে।তাই তো মামাকে পেলেই সে জোঁকের মতো মামার পিছু লেগে থাকে।


নাসিফকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে ঐ গাড়িতে গিয়ে বসাটা যে কত বড় অপমান ছিলো নাসিফের জন্য তা হয়তো আফিয়া ধারনাও করতে পারেনি।নাসিফের পুরো বদনে মেঘ ছেয়ে গেল অপমানে।গত পাঁচ মাসের সব চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হলেও এতটা খারাপ লাগেনি যতটা এখন এই মুহূর্তে এক  মহল্লা মানুষের সামনে আফিয়ার করা অপমানে লাগলো,শুধু তাকেই নয় তার বাবা মাকেও করলো।


মেঘে ডাকা কঠোর শ্রী নিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে র‌ইলো গাড়ীর পাশেই।নাবীহা মা'কে উঠতে অন্য গাড়ীতে উঠতে দেখে দৌড়ে নেমে গেলো। কাঁদো কাঁদো গলায় সেই গাড়ীর সামনে গিয়ে আম্মু বলে ডাক দিলো,


“ আম্মু আমি তোমার সাথে যাবো।"


সত্যি বলতে আফিয়া নাসিফকে এড়িয়ে চলতে গিয়ে নাবীহাকে সঙ্গে নেওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। তাছাড়াও ও ভেবেছিলো নাসিফ মেয়েকে এত মানুষের সাথে নিতে অনুমতি দিবে না।


নাবীহা গাড়ির দরজায় চাপড় মারছে আর বলছে, 

“ আম্মু আমি তোমার সাথে যাবো।"


“ রেজ‌ওয়ান ভাই, দরজাটা খুলে আমার মেয়েটাকে ঢুকতে দেন।" 


রেজওয়ান তখন‌ও বাইরে।সে দেখছিলো সবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পিছনের দিকে রাখা হয়েছে কি-না। আফিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে দরজা খুলে নাবীহাকে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির ভেতরে তার মায়ের কাছে দিলো।তখন‌ও তাইফ ঘুমাচ্ছিলো।নাবীহা গিয়ে মা আর খালার পাশে দাঁড়ায়।বসার জন্য জায়গা নাই বললেই চলে।সাফিয়ার কোলে যে বসবে তাতো সম্ভব নয়। করুন চোখে বাচ্চাটা তাকিয়ে থাকে।তার চোখের পানিতে গালে কালো ছোপ ছোপ দাগ পড়ে আছে।আফিয়া বুকের উপর শুয়ে থাকা ছেলেকে দেখে মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে নিজের হাঁটুর উপর চেপে বসিয়ে বললো,


“ সরি আম্মা। আম্মু তো ভাবছিলো তুমি বাবার সাথেই যাবে। আচ্ছা তুমি এখন এভাবে একটু বসো।ভাই উঠলে..


“ আপা ওকে আমার কাছে দাও।"


বলে নাবীহাকে মান্নাত চাইলো।নাবীহা ঐ মায়ের কাছেই থাকবে তাই সে নিজের মায়ের গলা জড়িয়ে রাখলো।সবাই যা বুঝার বুঝে গেলো। রেজওয়ান সব দেখে গাড়িতে উঠার আগে আফিয়ার দিকে ঝুঁকে বললো,


“ আপা তাইফকে আমার কাছে দেন।নাবীহাকে আপনার কোলেই বসান।

_ আর বলছিলাম..!"


রেজওয়ান কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো। আফিয়া ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকালো। জিজ্ঞেস করলো,


“ কিছু হয়েছে রেজ‌ওয়ান ভাই?"


“ বলছিলাম ভাইয়া মানে ওদের বাবাকে কি বলবো আমাদের সাথেই যেতে? মানে চাইলে আমরা সামনে দুজন বসতে পারবো।সবাই এক গাড়িতে আর উনি আলাদা, কেমন দেখায় না!"


“ সে তো সবকিছুতেই সবার থেকে আলাদা।তার চিন্তা শক্তি, বিবেক বোধ, ভারসাম্যতা সব, সবকিছুই তো আলাদা। সুতরাং সে আলাদা আসলেও কোন সমস্যা নাই।আর দরকার কি এত চাপাচাপি করার!সে এত চাপাচাপি করে চলতে ফিরতে অভ্যস্ত না। তাছাড়াও আপনার কোলে তাইফ থাকবে! সুতরাং আপনি বুঝতেই পারছেন!"


“ জ্বী আচ্ছা! আমি দেখছি; ওয়েট!"


রেজ‌ওয়ান বুদ্ধি খাটিয়ে মাঈনকে বললো,


“ মাঈন নিচে নামো!"


মাঈন নামলো। রেজওয়ান বললো,


“ তুমি ভাইয়ার কাছে গিয়ে বলো, ‘তুমি তাদের সাথে যাবে।' এতদূর একা যাওয়াটা সমীচিন নয়।তাও বাড়ির বড় জামাই বলে কথা। পার্সোনালি বিষয়টি আমার বেশ খারাপ লাগছে! হ্যা তার জন্য অবশ্যই যুক্তিযুক্ত কারণ আছে তবুও!"


“ জ্বী ভাইয়া।"


আফিয়ার খালু ,মানে মান্নাতের বাবাও নেমে গেলো।তিনি নাসিফের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো।নাসিফের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গাড়িতে বসা কালো বোরকায় আবদ্ধ ঐ নারীর দিকে।যে এখন একসাথে দুটো বাচ্চা সামলাতে ব্যস্ত। একবারের জন্যও তার দিকে ফিরে তাকায়নি।

সালাহ্ তাড়া দিলো, চেঁচিয়ে বললো,


“ আশ্চর্য আমরা কি বিয়ে বাড়ি যাচ্ছি যে এত নাটক হচ্ছে? কতক্ষন আব্বুকে এভাবে ফেলে রেখে কষ্ট দিবো?"


“ আসছি আমরা তুমি র‌ওনা দাও!" 


বলেই রেজ‌ওয়ান নাসিফের গাড়ীর দিকে এগিয়ে গেলো।নাসিফ খালু শ্বশুরকে দেখে একটু সোজা হয়ে স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়ালো।মান্নাতের বাবা মানিক মিয়া নাসিফের দিকে গিয়ে বললো,


“ জামাই চলো আমরা পুরুষেরা এক সাথেই যাই।ওরা মেয়েরা একটু আরাম করে যাক।"


রেজওয়ান এগিয়ে গিয়ে বললো,


“ ভাইয়া আমি ঐ গাড়ীতে আছি আপনার চিন্তা করতে হবে না।আপনি খালু আর আংকেলকে নিয়ে আসেন।"


এই মুহূর্তে কোন বাড়তি কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাইলো না।তাই সম্মতি সূচক মাথা নাড়লো,মুখে বললো,


“ হুম।"


আফিয়াও আর ফিরে তাকালো না। একের পর এক গাড়ি চলতে শুরু করলো।ড্রাইভারের পাশে নাসিফ, পেছনে নাযির আহমাদ, মানিক মিয়া,তার পেছনে মাঈন আর তার পিছনে সালাহর দুইজন বন্ধু বসলো। আফিয়াদের গাড়িতে মহিলা সহ  বশির,সেলিম মামা, রেজওয়ান,সহ আরো কিছু আত্নীয় বসলো।

সবার আগে নিয়াজ মোর্শেদের নতুন গাড়ি যেটা তাকে পৌঁছে দিবে নতুন বাড়িতে।তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার উত্তরাধিকারী একমাত্র পুত্র সালাহ্ আরশাদ মোল্লা এবং ভাগ্য জোরে পাওয়া নাতী নাইফ ওয়াসীত্ব গাজী।


শেষ যাত্রা শুভ হোক।রবের কাছে তার জবাবের পথ সহজ হোক। আল্লাহ কবরের জীবন সহজ হোক,সাওয়ালের জবাব সহজ করে দিক।আমীন।


বিরবির করে এক‌ই দোয়া পড়লো অনেকেই। সালাহর নিরব অশ্রু বিসর্জন আল্লাহর দরবারে তার পিতার জন্য কবুল হোক।নাইফ মামুকে কাঁদতে দেখে সেও কেঁদে দিলো।নানা ভাইয়ের কথা বারবার মনে পড়ছে।সেও মামার মতো নিরবেই কাঁদছে।


চলমান...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ