সুখ_প্রান্তর | পর্বসংখ্যা_৬

 #সুখ_প্রান্তর 

#শেখ_মরিয়ম_বিবি 

#পর্বসংখ্যা_৬



‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️


“ আসসালামু আলাইকুম গাজী ভাই সাহেব!"

“ ওয়ালাইকুমুস সালাম সাইফুল্লাহ ভাই,কেমন আছেন ,বলেন?"

“ জ্বী আল্লাহর রহমত আর আপনাগো দোয়ায় বহু ভালা আছি।আপনের শরীর খানা কেমন আছে?"

“ আলহামদুলিল্লাহ,সকলেই ভালো আছে। আপনার ঘরের লোকজন কেমন আছে?"

“ সবাই আল্লাহর রহমতে সুস্থ আছে!"

ঘটক ও গাজী সাহেবের কুশলাদি পর্বের মাঝেই তাদের পাশে এসে উপস্থিত হলো নাইফ ওয়াসীত্ব গাজী। ইফতারির আগ মুহূর্তে মেহমান আসায় সে কৌতুহলী হয়ে দৌড়ে এসেছে

নিজের ঘরে বসে গৃহ শিক্ষকের পড়া সম্পন্ন করছিলো। হঠাৎ কানে বেল বাজার শব্দ পেয়ে উঠে বাইরে বের হলো। আশা ছিলো বাবা আসবে। কিন্তু আসেনি।বাবা প্রতিদিন অফিসে ইফতার করে,মাঝে মাঝে তাদের সাথে করতে বাসায় আসে।নাইফ বলেছিলো আজ যেন বাবা বাসায় আসে,বাবা আসেনি, অবশ্য বাবা কথাও দেয়নি।অফিসে কাজের অনেক চাপ, সামনে ঈদ।ঈদের ছুটিতে যাতে কাজ জমে না যায় তাই এখন থেকেই বেশি বেশি করে রাখছে। আবার টাকার‌ও তো দরকার,কত খরচ এই রমজানে হয়।সকলকে বেতন বোনাস দিতে হয়।তাই নাইফ রাগ‌ও করতে পারলো না।তবে মুখটা ছোট হয়ে গেছে।

অবশ্য নাইফ প্রতিদিন দাদা দাদী আর ফুফু আর ছোট বোনের সাথেই ইফতারি করে, শুধু মাঝে মাঝে বাবা আসে,কখনো সখনো এমন মেহমান থাকে।

ঘন দাঁড়িওয়ালা এই দাদুকে আগেও দেখেছে বাসায়।ঐ যে ঐদিন যখন বাবা ও জুবায়ের চাচ্চু ছিলো ইফতারিতে সেদিন। নাইফ দাদুর কোল ঘেঁষে বসলো, উপস্থিত মেহমানের উদ্দেশ্য বললো,

“ আসসালামু আলাইকুম!"

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম,কেমন আছেন দাদু ভাই?"

“ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ, ভালো,আপনি?"

“ আলহামদুলিল্লাহ!"

গাজী সাহেব নাতীকে এক হাতে আগলে ধরলেন,নাতী নাতনিকে যথাসাধ্য আদব শেখানোর চেষ্টা করেন উনারা ।তারাও বেশ দ্রুত তা রপ্ত করে নিয়েছে। নাইফকে শক্ত করে চেপে ধরেই ঘটকের উদ্দেশ্যে বললেন,

“ আপনি পাত্রীর বাড়িতে খবর পাঠান,আমরা আগামী সপ্তাহে যেকোন দিন উনাদের বাসায় ইফতার করতে চাই!"

“ আলহামদুলিল্লাহ, অতি উত্তম প্রস্তাব।আমি এইহান থেকে গিয়াই জানাবো। ইনশাআল্লাহ!"

“ হ্যা,তারাই যেন দিনক্ষন জানায়।আমরা তাদের সুবিধা অনুযায়ী‌ই যাবো।"

“ জ্বী,তেমন‌ই হবে যেমন আপনেরা চাইবেন!তাইলে আজ উঠি, আল্লাহ হাফেজ!"

“ একটু বসেন!"

গাজী সাহেব ঘটককে বসতে বলে নাইফের উদ্দেশ্য বললেন,

“ দাদু ভাই ভেতরে যাও তো,দাদীপাকে গিয়ে বলো এক হাজার টাকা দিতে!"

“ আচ্ছা দাদা ভাই!"

বলেই নাইফ দৌড়ে ভেতরে গেল।ফিরলো হাতের মুঠোয় এক হাজারের নোট আর পিছনে থাকা নাবিহাকে সঙ্গে নিয়ে।নাবিহা গুটি গুটি পায়ে হেঁটে এসে দাদার কোলে চেপে বসলো,গাজী সাহেব লাইফে বললেন,

“ টাকা ঐ দাদুকে দাও দাদাভাই!"

নাইফ হাত বাড়িয়ে টাকা দিলো।ঘটক সাইফুল্লাহ টাকা নিয়ে নাইফের মাথায় হাত রেখে বললেন,

“ আল্লাহ তোমাগো সহায় হোক, নিশ্চয়ই ভালো কিছু পাবা!"

“ আল্লাহ ভরসা।"

সাইফুল্লাহ উঠে দাঁড়ালো,গাজী সাবেক উদ্দেশ্য করে,

 “তবে আল্লাহ হাফেজ,আসসালামু আলাইকুম!"

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম!”

আজকে ঘটককে আর ইফতারের জন্য জোর করেনি কারণ তিনি আসার আগেই বলে এসেছেন উনার অন্যত্র নিমন্ত্রণ আছে।

〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️

“ আসসালামু আলাইকুম ভাবীসাব!"

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম,ভাইসাব,আহেন ভেতরে আহেন।

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলেন ঘটক সাইফুল্লাহ,

“ কেমন আছেন?"

সুলতানা আযিযাহ মাথার কাপড় টেনে আরো লম্বা করে উত্তর দিলেন,

“ আলহামদুলিল্লাহ,সকলেই ভালো আছে!

বসেন এদিকে!"

“ আমি বসতে পারমু না। তারাবীহতে যাইতে অইবো।খালি খবর দিতে আইছি। পাত্র পক্ষ একদিন আপনেগো ঘরে ইফতার খুলতে চায়।এহোন কবে কিভাবে করবেন তা আপনাগো জানাইতে ক‌ইছে।"

“ সত্য! আল্লাহ কি কন! তারা কত ধনী তাগো মতো মানুষের ইফতারের বন্দোবস্ত কেমনে কি?"

“ আরেহ ইফতার তো বাহনা।তারা এই সময়েই আফিয়া মারে দেখতে চাইছে এই যা। তাছাড়াও তারা ধনী মানুষ অইলেও মনের থেইকা ভালা মানুষ!"

পর্দার আড়াল থেকেই মা আর ঘটকের কথা শুনছে সাফিয়া।আফিয়া এখনো আসেনি।তবে হয়তো কিছু সময়ের ব্যবধানেই চলে আসবে।সালাহ্ তারাবীহতে অংশ নিতে মসজিদের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ছে।সুলতানা আযিযাহ বললেন,

“ আমি রাইতে জানাই, পোলাপাইন সব ঘরে আসুক।"

“ হ  হ এইডাই উত্তম অইবো।তয় আমি অহোন উঠি।আপনি জানাইয়েন।”

“ জ্বী, আচ্ছা, আসসালামু আলাইকুম!"

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম!"

“ কি কইলো সাইফুল্লাহ ভাই?"

জিজ্ঞেস করলেন নিয়াজ মোর্শেদ মোল্লা, এখন উনার গলা ভালো হয়েছে,কথা বলতে পারে স্বাভাবিক ভাবে। ছোট মেয়ের কাছে শুনেছে ঘটক আসার কথা।তাই স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন।সুলতানা আযিযাহ জানালেন পাত্র পক্ষের বিষয়ে।নিয়াজ মোর্শেদ বেধ সময় নিরব থেকে কিছু একটা মনে হতেই বললেন,

“ ওর মামাগো কাছে ফোন দাও,এক কাম করো আমারে ফোনটা দাও।আমি‌ই সবার সাথে আলোচনা করি।"

সুলতানা আযিযাহ নিজের মোবাইলটা দিলেন, নাম্বার টুকে টুকে এক হাত দিয়েই কথা বলতে থাকলেন একে একে তার অনেক আত্নীয়র সাথে।

মেয়ের সমস্যা জেনেও যারা এত আগ্রহ দেখিয়ে মেয়েকে নিতে চাইছেন তাদের জন্য আয়োজনে কমতি রাখতে চান না তিনি। তাছাড়াও এই মেয়েটা তার অনেক কষ্ট করেছেন,তার খুশির জন্য নিজের সবটুকু করতে চান।পায়ে হেঁটে করতে পারছেন না তো কি হয়েছে, যেভাবে পারবেন সেভাবেই করবেন।

তিনদিন পর.....

হাত ভর্তি ফলমূল আর নানা পদের মিষ্টি নিয়ে মোল্লা বাড়ির দোড়গোড়ায় অপেক্ষা করছে গাজী পরিবারের সব সদস্য আর ঘটক,ইমাম সাহেব।দরজায় কড়া নাড়লেন ঘটক সাইফুল্লাহ।

“ আসসালামু আলাইকুম সবাইকে।"

দরজা খুলতেই এক হাস্যোজ্জ্বল তরুনের মুখে ভেসে এলো মার্জিত ভঙ্গিতে সালাম।নাযির আহমাদ গাজী সহ সকলে এক যোগে তার প্রত্যুত্তর করলেন,

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম!"

“ ভালো আছেন সবাই?"

সালাহ্ দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়ে সবাইকে ভেতরে ঢোকার জন্য অনুরোধ করলো।একে একে ভেতরে ঢুকলো,ঘটক,ইমাম সাহেব,নাযির আহমাদ,তার চাচাতো বড় ভাই লিয়াকত আলী গাজী,তার সহধর্মিণী আঞ্জুমারা পাখি,নাসিফ আহমাদ, আরিফ জুবায়ের, নাসিফের ফুফা বিল্লাল ইদ্রিস এবং সালমা ফাওযিয়া সহ নাসিফের ফুফু নুরজাহান নূর গাজী এবং সবার ছোট পুরুষ সদস্য নাইফ ওয়াসীত্ব‌ গাজী। ছোট্ট ঘরটা কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো মেহমান দিয়ে।আজকে ইফতারের আয়োজন করেছে বসার ঘরে। সুন্দর পরিপাটি করে চাদর বিছিয়ে চারদিকে অন্য চাদর মুড়িয়ে রোল বানিয়ে সীমানা করে দেওয়া। অবশ্য পুরুষ আর নারীদের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেহেতু ঘটক আগেই জানিয়ে দিয়েছে আগত লোক সংখ্যা তাই মোল্লা পরিবারের জন্য বিষয়টি সহজ হয়েছে।

 এদিকে আফিয়ার আত্নীয় বর্গের মধ্যে রয়েছে আফিয়ার মামা,মামী আর এক মামাতো বোন, চাচারা গ্রামে থাকায় তারা আসতে পারেনি।তবে চাচাতো এক বোন এবং তার স্বামী এসেছে। তারা নিজেরাই সবটা হাতে হাতে করে সাজিয়েছে।

আজকের বিশেষ বিশেষ ইফতারির পদগুলো সাফিয়া রান্না করেছে।তাকে সহযোগিতা করেছে তার মা আর বোনেরা। সালাহ্ বোন জামাইকে নিয়ে বাজার সেরেছে।নিয়াজ মোর্শেদ মোল্লার গর্ব হয় তার ছেলেকে দেখে।সতোরো বছর বয়সী একটা ছেলে,কত‌ দায়িত্ব নিয়ে কাজগুলো করছে! যাতে বড় বোন বাবার কমতি মনে করতে না পারে। অবশ্য বুদ্ধি পরামর্শ বাবার থেকেই নিয়েছে।

গাজী পরিবারের সদস্যরা মুগ্ধ হচ্ছেন মোল্লা পরিবারের সবার আতিথেয়তা দেখে। পুরুষ সদস্যরা বসলো বসার ঘরে পাতা আসনে,আর নারীরা গিয়ে বসলো আফিয়াদের ঘরে।

ছোট পরিসরের এই বাড়িটা দেখতে আজ বেশ পরিপাটি লাগছে। সুন্দর করে সাজানো গোছানো।নাসিফের ফুফু বারবার এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখছেন সবটা।উনার মতে মেয়েকে দেখতে হলে আগে দেখতে হবে তার ঘরের পরিবেশ।যেই ঘরে মেয়ে থাকতেও ঘরের পরিবেশ এলোমেলো আর অপরিচ্ছন্ন থাকে, নিশ্চিত সেই মেয়ে সংসারি নয়।তাকে দিয়ে আর যাই হোক সংসার করা হয় না। ঐদিকে সালমা ফাওযিয়া আফিয়ার মামী মুন্নির সাথে আলাপ করছেন।

“ আসসালামু আলাইকুম!"

সালাম দিয়ে মহিলাদের ঘরে ঢুকলেন সুলতানা আযিযাহ,তাকে উত্তর করলো অতিথি মহিলা গন।

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম!কেমন আছেন আপা?"

“ আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ ভালো রাখছে,আপনেরা কেমন আছেন,আসতে কোন অসুবিধা হয় নি তো?"

“ না না ,এখান থেকে এখানে আসতে আর কি কি সমস্যা হবে?

আরে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসেন এখানে এসে আমাদের সাথে।"

বলেই নিজের দিকে টেনে নিলেন আঞ্জুমারা পাখি। ইতস্তত করতে করতেই তার দিকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে গেলেন সুলতানা আযিযাহ।তিনি রান্না ঘরে ছিলেন। সাফিয়া আর ওর চাচাতো বোন সিনথিয়া জোর করে তাকে পাঠিয়ে দেয় মেহমানদের সাথে আলাপ করতে। এদিকে মামাতো বোন মিষ্টির জিন্নাত আফিয়ার সাথে অন্য ঘরে আছে।

“ তা মেয়ের বাবা কি একদমই বিছানা থেকে উঠতে পারেন না?"

আফিয়ার মামা সেলিমকে জিজ্ঞেস করলেন লিয়াকত আলী,সেলিম বিনম্র ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন,

“ না!"

“ আহ্,কি জীবন! "

বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নাসিফের ফুফা 

বিল্লাল ইদ্রিস।নাযির আহমাদ বললেন,

“ সমস্যা নাই,আমরা নিজেরা গিয়েই সাক্ষাৎ করে আসি! কি বলেন,যাওয়া যাবে?"

জিজ্ঞেস করলেন সেলিমকে।সেলিম হাঁসি দিয়ে বললেন,

“ নিশ্চয়ই; একটু সময় দিন।আমি ভেতর থেকে আসছি।"

বলেই তিনি বোন জামাইয়ের কাছে গেল।

বাবার কপালে গাল ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে বসেছে আফিয়া। দৃষ্টি তার ঘোলাটে, ছলছল চোখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বাবার অসাড় পায়ের দিকে।নিয়াজ মোর্শেদ মেয়ের এক হাত আঁকড়ে অবিরত তাঁতে ঠোঁটের ছোঁয়া দিচ্ছে।আর আস্তে করে কথা বলছে, মিষ্টি বাবা মেয়ের এমন দৃশ্য বিমোহিত চোখে দেখছে,

“ হোনো আম্মা জন্ম মৃত্যু বিয়ে সব আল্লাহর হাতে।তিনি যা উত্তম আমাদের জন্য তাই করবেন। অনেক সময় আমরা যাই চাই তা না পাইলে আল্লাহরে দোষারোপ করি, কিন্তু এইটা ঠিক না। নিশ্চয়ই আমরা উনার(আল্লাহ) চেয়ে বেশি বুঝি না।বেশি জ্ঞানী না।

তাই আল্লাহ যেভাবে আমাদের গতিপথকে প্রসারিত করতাছেন সেইভাবেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এতেই  আমাদের জন্য কল্যান।

_ আম্মা,আপনে আমার আম্মা। আমার মেজো আম্মা।আমারে জন্ম দিছে এক আম্মা,হ্যায় আমারে ফালাইয়া আল্লাহর কাছে চ‌ইলা গ্যাছে বহুবছর আগে,যাওয়ার আগে আল্লাহর কাছ থেইকা চাইয়া আমারে আপনেরে দিয়া গ্যাছে।যাতে আমার মায়ের অভাব না অয়,আপনে আমার সেই আম্মা যে একটা অচল পয়সারে বাজারে তুলছে,যার কদর মাইনসের সামনে না থাকলেও আপনি দিয়াছেন, আমার অক্ষমতা পুরা পৃথিবীর থেইকা ঢাইকা রাখছেন।আমার আর আপনের মায়ের গর্ব,আমরা আল্লাহর দেয়া সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে আপনেরে পাইছি। আল্লাহ আমারে অসহায় করবে দেইখাই হয়তো আপনেরে আমার জন্য পাঠাইছে।আমি আপনার কাছে অনুরোধ করবো আপনে যত‌ই কষ্ট পান,কখনো অন্যরে কষ্ট দিয়া কথা বলবেন না। আপনার ব্যবহারের যেন কারো মনে আঘাত না লাগে আম্মা। সবসময় শ্বশুর শাশুড়িকে সম্মান করে কথা বলবেন,যেমন করে আপনে আমারে আর আপনের মায়েরে করেন।স্বামীর আদেশ ছাড়া কিছু করবেন না,আমগো খোঁজ খবরও নিতে আইবেন না।তারা যেন কোনদিন আপনের শিক্ষায় আঙ্গুল তুলতে না পারে।আমি যেন শেষ নিঃশ্বাস অবধি আমার আম্মার তারিফ সবার মুখে মুখে দেখি।

_ তয় মনে রাখবেন বেশি কষ্ট অইলে আব্বার কাছে চইলা আসবেন। আপনের আব্বা যতদিন আছে আপনের কষ্ট বুকে পুষতে অইবো না। দরকার পড়লে আমি আমার আম্মারে নিয়া ভিক্ষা করমু তাও আপনে নিজেরে চাপ দিবেন না?..

“ ভাইয়া!"

বাইরে থেকে সেলিমের হাঁক,নিয়াজ মোর্শেদ কথা থামিয়ে দিলো।আফিয়া উঠে বসে নিজের গায়ের ওড়না টেনে ঠিক করলো।চোখ মুছে মুখ পরিষ্কার করে ফেললো। সেলিম পরিস্থিতি ঠাওর করে বললেন,

“ আরে মাইয়াডারে কান্দাইতাছেন ক্যান।বাইরে মেহমান আছে আর আপনি!"

মাথাটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে মেয়েকে দেখলেন নিয়াজ মোর্শেদ,আফিয়া ততক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে বসেছে।সেলিম এগিয়ে এসে ভাগ্নির উদ্দেশ্যে বললেন,

“ মা তোমরা একটু বারান্দায় যাও। মেহমানদের পুরুষলোক তোমার আব্বার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবে।"

আফিয়া মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মিষ্টির হাত ধরে বারান্দায় গেলো। এরপর সেলিম বোন জামাইয়ের পড়নের লুঙ্গি টেনেটুনে ঠিক করলো, গায়ে একটা পাতলা কাঁথা দিয়ে বললো,

“উনারা আপনের সাথে পরিচিত হতে আসবো, ঠান্ডা হয়ে কথা বলিয়েন।মাইনসের সামনে কান্নাকাটি ক‌ইরেন না।"

মাথা উপর নিচ করলেন, অর্থাৎ তিনি বুঝেছেন।

সেলিম মামা বাইরে গিয়ে বসার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন,

“ আপনেরা আসেন!"

হাত দিয়ে ইশারা করে সামনে এগুতে বললেন,সব পুরুষ সদস্য গেলো।সবার পেছনে ছিলো সালাহ্ এবং তার চাচাতো বোন জামাতা বশির আহমেদ।

সালাহ এবং বশির দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে র‌ইলো, সেলিম মেহমানদের সঙ্গে ভেতরে গেলো পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলে উনারাই পরিচয় দিবেন বলে জানালো।

“ আসসালামু আলাইকুম,ভাই সাহেব,আমি নাযির আহমাদ গাজী,এই আমার ছেলে নাসিফ ওয়াসীত্ব গাজী।"

ডান দিকে আঙুল ঘুরিয়ে বললেন,

“ উনি আমার বড় ভাই, লিয়াকত আলী গাজী,আর এই যে আমার বোন জামাতা  বিল্লাল ইদ্রিস আর এ হচ্ছে..

একে একে বাকীদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলেন! নিয়াজ মোর্শেদ উঠার চেষ্টা করছিলো।নাসিফ এগিয়ে গিয়ে উনার হাত ধরে বললেন,

“ কেমন আছেন আপনি?উঠতে চাইছেন?"

 নাসিফের প্রশ্ন শেষ হ‌ওয়ার আগেই নিয়াজ মোর্শেদ কাঁদতে কাঁদতে নাসিফের হাত নিজের কপালে ঠেকিয়ে বললেন,

“ আল্লাহ রাখছে বাবা,আপনেরা চাইলে আরো ভালো থাকবো।"

“ ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে ভালো দিন দিবেন!"

“ আমীন।"

একে একে সবাই বললো,আমীন।

“ উঠার দরকার নাই,শুয়ে থাকেন!"

নাযির আহমাদ বললেন,নিয়াজ মোর্শেদ শান্ত হয়ে আবারও মাথা পাতলেন বালিশে, তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ আমরা নিতান্তই গরীব সাধারণ মানুষ,সাধ থাকলেও সাধ্য আল্লাহ দেয় নাই।তাই অনুরোধ করছি ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে দিয়েন, চেষ্টা করেছি সামর্থ্য অনুযায়ী করার!"

উনার কথার পিঠে লিয়াকত আলী গাজী বললেন,

“ আহ্; কি সব বলেন।আমরা এসেছি আত্নীয়তা করতে,আত্নীয় হয় আত্নার বন্ধনে,পেট পূজা করে আত্নীয় বানানো যায় না।আপনে চিন্তা করিয়েন না আল্লাহ কবুল করলে ভবিষ্যতে আমাদের একসাথে পাশাপাশি বসে কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া দাওয়া হবে। ইনশাআল্লাহ!"

“ আল্লাহ কবুল করুক।"

“ শুয়ে থাকেন,আমরা না হয় বাইরে গিয়ে আসল কাজটা সাড়ি?"

“ হ্যা,হ্যা!"

“ চলেন তাহলে!"

একে একে সবাই বেরিয়ে গেল, পেছনে রয়ে গেল আরিফ জুবায়ের, নাসিফ আর নাইফ।নাসিফ যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে হাত টেনে ধরলো নাইফ,নাসিফ পেছনে ঘুরে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো,

“ কি হয়েছে বাবা?"

নাইফ বাবার হাত টেনে ধরে নিচে বসতে বললো, নাসিফ এক হাঁটু ভেঙ্গে আরেক হাঁটু ভাঁজ করে বসলো, জিজ্ঞেস করলো,

“ হ্যা বলো,কি হয়েছে?"

“ এই দাদুটার কি হয়েছে বাবা?"

নিয়াজ মোর্শেদ‌ও তাকালো শুভ্র পাঞ্জাবিতে মায়াবী চেহারার এই বালকের দিকে। একদমই বাবার কপি। বাবা ছেলে এক‌ই রঙের,এক‌ই ডিজাইনের পাজামা পাঞ্জাবী পরিহিত।বালকের দৃষ্টি তার দিকে পড়তেই সে হাসলো।নিয়াজ মোর্শেদকে হাসতে দেখে নাইফ নিজের বাবার পানে চাইলো।নাসিফ ছেলেকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো,

“ দাদু অসুস্থ বাবা,তাই উঠতে পারছে না।তুমি দাদুকে সালাম দিয়েছো?"

নাইফ মাথা দুলিয়ে বললো, “না!"

“ দেওয়া উচিত ছিলো না?"

বললো নাসিফ।নাইফ নিজের ভুলে মাথা নত করে নিলো।বাবা তাকে শিখিয়েছিলো যে কারো সাথেই দেখা হোক সর্বপ্রথম সালাম দিবে এরপর তার কুশলাদি জিজ্ঞেস করবে।এটা হচ্ছে মুসলমানদের প্রথম আদব।নাইফ অবশ্য দেয় কিন্তু আজ নতুন জায়গায় এতগুলো নতুন মানুষ দেখে একটু ভয় পাচ্ছে।নাসিফ কিছুই বললো না , ছেলের দিকে তাকিয়ে র‌ইলো,নিয়াজ মোর্শেদ হাঁসি চোখে দেখছে ছোট্ট বালকের এমন লজ্জিত বদন।নাইফ ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে বাম হাতের আঙ্গুল ঘষাঘষি করতে করতে বললো,

“ আসসালামু আলাইকুম দাদু,আপনি কেমন আছেন?"

“ নিয়াজ মোর্শেদ নিজের সচল ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলো, নিজের কাছে ডাকছে।নাইফ বাবার দিকে তাকালো,নাসিফ বললো,

“ যাও,দাদু ডাকছে!"

বাবাকে ছেড়ে নিয়াজ মোর্শেদের দিকে এগিয়ে গেল,নিয়াজ মোর্শেদ নাইফের মাথায় হাত রেখে বললো,

“ ওয়ালাইকুম আসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি দাদু! আপনি কেমন আছেন?"

“ আলহামদুলিল্লাহ,আমিও ভালো আছি দাদু!"

“ আচ্ছা আমরা তবে বাইরে যাই আংকেল, ইফতারির সময় হয়ে যাচ্ছে, আযান পড়ে যাবে।"

আরিফ তাড়া দিলো,নাসিফ নাইফকে বললো,

“ দাদুর থেকে বিদায় নাও বাবা।"

বাবার আদেশ অনুযায়ী নাইফ বললো,

“ আল্লাহ হাফেজ দাদু,আমি বাইরে যাই।"

“ হ্যা যান,আবার আসিয়েন। আল্লাহ হাফেজ!"

‘আল্লাহ হাফেজ' বলে নাইফের হাত ধরে সামনে ঘোরার জন্য পা বাড়াতেই বারান্দায় চোখ আটকালো,নাসিফের চোখ পড়তেই ঐখানে থাকা ছায়াটা সরে গেল।তবে গোলাপী রঙের একটা সুতি ওড়না দরজার পাশে উড়তে দেখা যাচ্ছে।তার সাথে দুটো ছায়া নিচে জমিনে দেখা যাচ্ছে।

চলবে??

জানাতে ভুলবেন আজকের পর্বটা কেমন ছিলো!

আমার মা নেই তাতো জানেন‌ই,আছে শুধু অসুস্থ বাবা তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক তাই অনুরোধ করবো সবাই তার জন্য দোয়া করবেন 😭

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ