#সুখ_প্রান্তর
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
#পর্বসংখ্যা_২২
‼️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ‼️
“ তোমরা চলো। নানা ভাইয়ের সাথে। কিছুদিন নানু নানীর সাথে থাকবে!"
কথাটা বলে নাতীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে ঠিক করে এক পাশ করে রাখলেন।নাইফ তার নিজের নানার বাঁধন থেকে ছুটে সোজা হয়ে বসে বললো,
“ কিন্তু আমার তো স্কুল ছুটি হয়নি! আর স্কুল মিস করলে তো পরীক্ষায় বসতে দিবে না।"
“ সে আমি বুঝে নিবো নে!তুমি গিয়ে নিজের কাপড় চোপড় গুছাও।তোমার ফুফুকে বলো নানা বাড়ি যাবো কাপড় গুছিয়ে দাও।"
“ কিন্তু মা যেতে দিবে না।বাবাও বকা দিবে যদি স্কুল কামাই করি!"
“ বাবাকে আমি দেখো নিবো। কিন্তু মা কে? আর সে কেন দিবে না?সে কি তোমাদের সবকিছুতেই বাঁধা দেয়?"
“ বাবা আমাদের জন্য মা এনেছে তুমি জানো না?তোমাকে তো আমি বলেছিলাম ফোনে।মা আমাকে আর বনুকে একা কোথাও যেতে দেয় না। নতুন নানা বাড়িও না।"
“ নতুন নানা বাড়ি মানে?"
“ ওমা আমার নতুন নানা বাড়ি হয়েছে না! যেখানে আগে মা থাকতো!"
“ তুমি তোমার সৎ মাকেও মা বলে ডাকছো আবার তার বাড়ির লোকদের নানা বলে ডাকছো!কেন?"
“ সৎ মা কি? বাবাই তো বলেছিলো তাদের নানা নানু ডাকতে।"
বাচ্চা নাইফ সৎ মায়ের অর্থ বুঝে না তাকে বুঝতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তাকে আরো বেশি কিছু বোঝানোর আগেই উপস্থিত হয় নাযির আহমাদ।তিনি কুশলাদি করেই একটু সময়ের জন্য ভেতরে গিয়েছিলেন।মূলত নানা নানীর সাথে নাইফ নাবীহাকে একা ছেড়ে দিয়েছিলেন।নাসিফও এসে পৌছালো। শ্বশুর শ্বাশুড়িকে সালাম করে।আমিরার বাবা আমির সওদাগর মেয়ে জামাইকে দেখে উঠে দাঁড়ালো।দু জন কোলাকুলি করে পাশাপাশি বসলো। এরপর টুকটাক কথাবার্তা বললো মূলত নাসিফের পেশাগত দিক নিয়ে।
কোরবানির ঈদ গেলো আজ প্রায় পনেরো দিনের বেশি।ঈদে উনারা দেশে ছিলেন না তাই নাতী নাতনির জন্য উপহার দিতে পারেন নি তার জন্য অনুশোচনা অনুভব করছেন, কিন্তু আজ গাড়ী বোঝাই করে উপহার নিয়ে এসেছে ।যদিও তার অধিকাংশই নাইফের জন্য।নাবীহাকে নিয়ে তাদের খুব একটা ভাবনা নেই।তার কারণও তাদের কাছে আছে, খুব স্পষ্ট।নাবীহা পেটে থাকা অবস্থাতেই আমিরার সমস্যা দেখা দেয়।ডাক্তারের ভাষ্যমতে বাচ্চাটা জন্ম দেওয়া আমিরার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো।উনারা সাজেস্ট করেছিলেন গর্ভপাতের। কিন্তু আমিরা তাতে রাজী হয়নি।প্রথমত বাচ্চা নাসিফের খুবই পছন্দ।যখন বাচ্চাটা তার পেটে আসলো নাসিফ সবসময় বলতো আল্লাহ যেন তাকে এবার কন্যা সন্তানের সৌভাগ্য দেয়। এমনকি নামাজেও তাই আর্জি করতো।স্বামীর এমন পাগলামি যেকোন স্ত্রীর জন্যেই সৌভাগ্যের যেখানে কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার দায়ে এখনো বহু নারী সংসার ছাড়া হয়।আর তারপর তার নিজেরও ইচ্ছা ছিলো, তাছাড়াও একটা বাচ্চা একটা নারীর জন্য কি তা কেবল নারী মনই জানে।আর সে তো মা! মায়েরা কি কখনো পারে এমন স্বার্থপর হতে? তারা কি কখনোই নিজের সন্তানকে নিজের জন্য খুন করতে পারে? সত্যিকারের মায়েরা পারে না।আমিরাও পারেনি। সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো ধর্মজ্ঞান! গর্ভপাত স্পষ্ট নিষিদ্ধ সেটা জানার পর কোনমতেই আমিরা এমন জঘন্য কাজ করতে পারেনি।
এমনকি সে এই সত্যটাও কাউকে বলেনি।সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছে।ব্যাবসায়ে ব্যস্ত নাসিফেরও সময় হয়নি স্ত্রীর এত গোপন খবরের হদিস নেওয়া। কিন্তু নাবীহাকে প্রায় দেড় বছরের রেখে হঠাৎ করেই যখন আমিরা মারা গেলো তখনই সব সত্য সামনে এলো। হসপিটালে হসপিটালে দৌড় ঝাঁপ আর পুরানো চিকিৎসার কাগজপত্র ঘাটতেই এবং নিয়মিত দেখানো চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতেই বেরিয়ে এলো সবচেয়ে যন্ত্রনাদায়ক সত্যটা।আমিরা নিজের জীবনের সমাপ্তির খবর পেয়েছে নাবীহাকে দুনিয়াতে আনার পরপরই।তখনও সে সত্য লুকিয়েছে। সবকিছু শোনার পর আমিরার বাবা মা নাসিফকে দোষারোপ করেছিলো। তাদের ভাষ্যমতে নাসিফের অবহেলা আর বাচ্চা প্রীতিই তাদের মেয়েকে শেষ করেছে।ঠিক এই কারণেই আমিরা মারা যাওয়ার পর প্রায় আট নয় মাস কোন খোঁজ খবর নেয়নি। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই ফোন দিয়ে বললো নাসিফ দ্বিতীয় বিয়ে করতে এবং পাত্রী হিসেবে পছন্দ করেছে তাদের ভাগ্নী।যেহেতু তালাকপ্রাপ্তা এবং বন্ধ্যা তাই তার নাতী নাতনির যত্ন করবে ঠিকঠাক। কিন্তু তাতেও যখন নাসিফ নারাজি করলো আরও ক্ষেপে গেলেন। বললেন নাসিফ যেন আর কখনো বিয়ে না করে। আর যদি করে তবে তারা তার নাতির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সবরকমের আইনি ব্যবস্থা নিবেন।তাতে যাই হোক।তবুও নাতিকে সৎ মায়ের যন্ত্রনা সহ্য করতে দিবে না।উনারা বারবার স্পষ্ট করে বলেছিলো নাতি নাতি এবং নাতি । এতেই পরিষ্কার হয় নাবীহাকে নিয়ে তারা কিছু ভাবে না।তবে কি তারা এই বাচ্চা ,শিশুকেই তার মায়ের হত্যাকারী ভাবছে! তাদের মনে পুষেছে এমন কুৎসিত চিন্তা!নাসিফের
প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন মস্তিষ্কে কথাটা ঘুরপাক খেতেই সিদ্ধান্ত নিলো সে তার বাচ্চাদের এমন মানুষদের থেকে দূরে রাখবে।যারা কিনা এমন কলুষিত, জঘন্য মনোভাব পোষন করে এবং শিশুদের মাঝে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে।
এরপর থেকেই বাচ্চাদের প্রতি নিজের সময় দেওয়া বাড়িয়ে দিয়েছে।নাইফকে পড়াশোনা এবং খেলাধূলায় ব্যস্ত রেখেছে এবং নাইফের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিয়েছে পড়াশোনা নিয়ে কোন হেয়ালি বাবা ক্ষমা করবে না।যদিও নাইফের বড় খালার জন্য নাইফের নানা নানীকে ঘনঘন দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে তাই তারাও পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছে না।
এইতো এবার রোজার সময় বড় মেয়ের কাছে কানাডা গিয়েছিল, সেখান থেকে সোজা মক্কা গিয়ে হজ্জ করে কোরবানি দিয়ে অতঃপর ঢাকায় পৌঁছেছে।তাও বোধহয় সপ্তাহ পেরুলো।শোনা মতে আবারো খুব শিগগিরই কানাডা যাচ্ছেন তাই নাসিফ বাঁধা দেয়নি বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে।
“ আসসালামু আলাইকুম!"
সালাম দিয়ে নাস্তার ট্রলি টেনে এনে এ ঘরে ঢুকলো।
নাসিফের পছন্দের সেই জামদানী তার গায়ে,আঁচল মাথায় তোলা।নত নজরেই সালাম দিলো নতুন দুই মুরব্বি গোছের নারী পুরুষকে।তারাও সালামের প্রত্যুত্তরে বললো,
“ ওয়া আলাইকুম আসসালাম।"
“ কেমন আছেন আপনারা?"
“ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ আমরা ভালো। তুমি?"
“ আলহামদুলিল্লাহ আপনাদের দোয়ায়।আসতে কোন সমস্যা হয়নি তো?"
“ না সমস্যা কি হবে? আমরা কি এখানে নতুন আসি নাকি? একই জায়গায় কতবার এসেছি সেখানে আবার সমস্যা কিসের?"
কথাটা ছিলো বেশ বিরক্তি ঝেড়ে তাই আফিয়া কথা বাড়ানোর সাহস করেনি।নাইফ নানার কাছ থেকে উঠে মায়ের কাছে গিয়ে বসে বললো,
“ মা, নানু ভাই বলেছে আমাকে নানু বাড়িতে বেড়াতে যেতে কিছু দিনের জন্য!আমি কি যাবো?"
“ না।"
আফিয়ার আগেই উত্তর দিলো নাসিফ। ছেলের দিকে কঠোর চোখে তাকিয়ে আছে।আফিয়া আশ্চর্য চোখে দেখছে নাসিফকে। ছেলে মেয়ের সাথে কঠোর আচরণ তো দূরের কথা দুটো উঁচু শব্দ
উচ্চারণ করে না অথচ এতগুলো লোকের সামনে এভাবে!নাইফ বাবার চাহনিতে ভয় পেয়ে মায়ের সাথে সেটে গেছে।আফিয়া ছেলেকে নিজের আড়ালে আগলে রেখে নাসিফের দিকে চাইলো।নাসিফ আফিয়ার দিকে চোখ রাঙানি দিয়ে ছেলেকে উদ্দেশ্য করো বললো,
“ তোমার না নেক্সট মান্থে পরীক্ষা! তবে তুমি এখন বেড়াতে যাওয়ার কথা বলছো কোন সাহসে?"
“ ও ছোট মানুষ।নানা নানী বলছে তাই ও বলছে,ও তো এখনই চলে যাচ্ছে না।আপনি শান্ত হোন!"
“ ছেলেকে বোঝাও পড়াশুনা নিয়ে হেয়ালি একদমই বরদাস্ত করবো না আমি!"
“ আশ্চর্য আমি অভাব হচ্ছি। এতটুকু মা ছাড়া ছেলের প্রতি তোমার কঠোরতা দেখে।এসব কি ব্যবহার করো তুমি এই সাত বছরের বাচ্চার সাথে?"
নাইফের নানী বড় বড় চোখ করে নাসিফকে দেখছে।নাসিফ শ্বাশুড়ির দিকে না চেয়েই বললো,
“ আম্মা প্লিজ, আমার বাচ্চাদের সাথে আঐম কেমন ব্যবহার করবো এটা একান্তই আমার বিষয়, দয়া করে বাচ্চাদের সামনে কোন বিতর্ক সৃষ্টি করবেন না।"
“ বাহ্ আপনার ছেলের তো দেখি ভালোই উন্নতি হয়েছে বেয়াইন। একেবারে নতুন বউ ঘরে তোলার সাথে সাথেই তার ব্যবহারের হুলিয়া চেঞ্জ! আমাদের সামনেই এমন করে তাহলে আমাদের অগোচরে কি করে?"
“ যেমন ভাবছেন তেমন কিছু নয় ।
বাবু স্কুলে যাওয়া নিয়ে... এমন করে না বললেও হতো তাই না।উনি তোমার মুরব্বি তার সাথে তাও আবার বউমার সামনে কি দরকার ছিলো?"
বেয়াইনকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও মাঝে থেমে গিয়ে ছেলেকে বললেন কথাটা সালমা ফাওযিয়া।আফিয়াও লজ্জা পাচ্ছে এমন একটি পরিস্থিতিতে। ভদ্রমহিলা পরোক্ষভাবে আফিয়াকেই দোষারোপ করলো।আমিরার মা মেহেরবান বললেন,
“ তুমি কি চাইছো না ওরা আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখুক।সত্যি করে বলো তো?"
“ কেন চাইবো না। অবশ্যই চাইবো।আপনারা আমিরার মা বাবা,আমিরার বাচ্চা ওরা। আপনার সন্তানের চিহ্ন ওরা। ওদের প্রতি অবশ্যই আপনাদের অধিকার আছে,দেখা সাক্ষাৎ সবকিছুই করার অধিকার আছে। কিন্তু তাই বলে পড়াশোনার ক্ষতি করে? আমি কোনভাবেই আমার বাচ্চাদের ভবিষ্যত নিয়ে হেলা করতে পারি না।"
“ সে তুমি কি পারো কি পারো না তা দেখাও হয়েছে আর বোঝাও হয়েছে!
আর বেশি কিছু বলো না,আমিও কথা বাড়াতে চাইছি না।"
“ আচ্ছা ঠিক আছে,আমরা এখানেই থামি
খালাম্মা আপনি তো কিছুই মুখে দিচ্ছেন না।একটু কিছু মুখে দিন।"
মেহেরবান গাঢ় নজরে আফিয়াকে দেখলো।আফিয়া ঐ নজরে অস্বস্তিতে পড়ে গেলো।তাই কাজের বাহানায় এখান থেকে সরে আসলো।আফিয়ার যাওয়ার পানে চেয়ে নাসিফ সকলকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ আমি ঘর থেকে আসছি।আপনারা কথা বলুন!"
“ হু!"
নাযির আহমাদ আর সালমা ফাওযিয়া ছেলের এমন ব্যবহারের কারণ জানে তাই উনার কিছু বলেন নাই। এদিকে মেহমানকেও বলা যায় না যেখানে তাদের মৃত মেয়ের সংসার এটা। উনারা এটাও ভালো করেই বুঝতে পারছেন নাইফের নানা নানী আফিয়াকে খোচাবেই। কিন্তু কি করবে?
চলমান.....
আজ লিখতেই ইচ্ছা করতেছিল না, শুধু আপনাদের জন্য লিখলাম🌸







0 মন্তব্যসমূহ