#সুখ_প্রান্তর
#সারপ্রাইজ_পর্ব_২_এর_সংযোজিত_অংশ
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
[মানে যা খুশি হচ্ছে লিখছি,কেন যে লিখছি তা বুঝতে পারছি না।আজকে রাতে চেষ্টা থাকবে সুখ_ফড়িং নতুন পর্ব দেওয়ার। যদি এটাতে ভালো রেসপন্স পাই তবেই দিবো নয়তো না।]
রাতের বেলা.....
বসার ঘরে বসে নাইফ একটা ইংলিশ নভেল পড়ছে, তার পাশে বসেই তুহি নিজের পুতুলের পোশাক বদলাচ্ছে,তাইফ অন্য সোফায় বসার জায়গায় মাথা রেখে হেডে পা রেখে শুয়ে আছে।তার হাতেও তার অস্ত্র ,একটা মোটরের মতো যন্ত্র যেটায় সে তার পেছাচ্ছে।তুলতুল নিজের পড়া শেষ করে এদিকে আসতে আসতে বলতে আরম্ভ করলো,
“ ভাইয়া কিছু খেতে ইচ্ছে করছে!"
“ তো আম্মুকে বল,আমি কি করবো?"
নাইফের কাঠখোট্টা জবাব,তুলতুল নাক খিঁচে নিয়ে বিরক্ত চোখ চেয়ে বললো,
“ ঘরের খাবার খেতে হলে তো আম্মুকেই বলতাম, তুমি বাইরে থেকে এনে দাও!"
“ বাইরে থেকে? বাইরে থেকে আমি কি আনবো? আমি এখন কোথাও যাবো না।যা ভাগ..."
“ ঠিক আছে তুমি না গেলে আমিই যাই তাহলে!"
“ বুবুন আমাকে টাকা দেও,আমি যাই। তুমি বলো কি আনবো?"
তাইফ চট করে লাফ দিয়ে সোজা দাড়িয়ে একদম তৈরি হয়েই কথাটা বললো।তার এহেন আগ্রহের কারণ এ বাড়ির সকলের অবগত,তাই নাইফ তুলতুল চোখ চোখা করে তার দিকে তাকালো।নাইফ চোখ রাঙানি দিয়ে বললো,
“ এই ভর সন্ধ্যায় ঘরের বাইরে পা রাখলে পা নিয়ে হাঁটার অবস্থায় রাখবো না আর।"
তাইফ মুখ লটকিয়ে নিলো।বললো,
“ তাহলে তুমি যাও,বুবুনের বুঝি ভালোমন্দ কিছু খেতে ইচ্ছে করে না? সবসময়..."
“ তাইফ তুই আমার হাতে সত্যিই মার খাবি কিন্তু তর্ক করলে!"
নাইফ সতর্ক করলো,তাইফ গাল ফুলিয়ে মুখটাকে বাংলার পাঁচ বানিয়ে ধপ করে বসে পড়লো,তার চাহনি এমন যেন সে মনে মনে ভাইকে চিবিয়ে খাচ্ছে। কিন্তু মুখে বলতে পারছেনা। এদিকে বুবুনের ছুতোয় বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনাও ভেস্তে দেওয়া যায় না তাই সে আবারও একটা ঝুঁকি নিলো, বিরবির করে বুবুনকে শুধালো,
“ তুমি কি ফুচকা খাবে বুবুন! তাহলে বেশি দূরে না,এই যে আমাদের গেইটের ঐপারেই তো গলিতে একটি ফুচকার দোকান সেইখানে..."
“ না,থাক আমি কিছুই খাবো না আর।আর তোমাকেও এত রাতে বাইরে যেতে হবে না!"
“ এ্যাই তুই ওকে খোচাচ্ছিস ক্যান? দাঁড়া তোর বাইরে যাওয়া আমি ছুটাচ্ছি,ফাজিলের হাড্ডি.!"
বলেই নাইফ হাতের বইটা পাশে রেখেই উঠতেই তাইফ ছুটে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো।
“ তুমিও যাবে না আমাকেও যেতে দিবে না কেন? তুমি একটা পঁচা ভাইয়া!"
শেষ করেই দরজা লাগিয়ে দিলো, দরজা লাগানোয় নাইফ আবার নিজের জায়গায় এসে বসলো,তার খাওয়া নিয়ে ভাইদের দ্বন্দ্ব দেখে তুলতুল অনীহা দেখিয়ে বললো,
“ না থাক কাউকেই যেতে হবে না। এমনিতেই থাকো সবাই।একটু মজাই তো খেতে চাইলাম আর তাতেই ঘরে যুদ্ধ বাজিয়ে দিলো। যতসব!"
বলেই সেও মুখটা লটকে নিয়ে অন্য পাশের সোফায় বসে আঁকিবুঁকি করছে। তার দিকে বিশেষ ধ্যান নাইফ আর দিলো না। এদিকে বুবুনের মুখে মজা শব্দ শুনেই এবার তুহিও বায়না শুরু করলো সেও মজা খাবে।
“ আমিও মজা খাবো!"
নাইফ ছোট বোনের কথায় বই থেকে মুখ সরিয়ে তাকালো, তুহি তার ছোট হাত দুটো মাথায় রেখে ছোট শব্দে ভাইয়ের দিকে চেয়ে আবদার করছে,
“ মজা খাবো!"
তুলতুলও চোখ তুলে চাইলো,নাইফ হাঁক পেড়ে মায়ের উদ্দেশ্য বললো,
“ আম্মু কিছু দাও না খেতে,বুড়ি খেতে চাইছে!"
মা'কে ডাক দিয়ে তার সম্পর্কে কিছু বলছে,এটা খুব বুঝলো যেন তুহি।সে নিজের মাথা দুদিকে ঘুরিয়ে বললো,
“ না মজা খাবো!"
নাইফ বোনকে নিজের হাঁটুর উপর বসিয়ে বললো,
“ আচ্ছা আম্মু দিবে মজা।"
“ আম্মু মজা দেয় না!"
“ দিবো!"
ততক্ষণে আফিয়া প্লেট ভর্তি করে চার ছেলে মেয়ের জন্য ফল কেটে আনছে। নাইফ এক টুকরো আপেল নিয়ে তুহির মুখে ধরতেই তুহি সেটা কামড় দিয়ে ধরেও ফেলে দিলো। তুলতুল মুখ ফিরেও তাকালো না।আফিয়া ক্ষিপ্র চাহনিতে দুই মেয়েকেই দেখলো, এরপর বললো,
“ কি হয়েছে? একটু আগেই শুনেছিলাম কিছু খাবো বলে তিন ভাই বোন যুদ্ধ পাকিয়েছো? এখন কেন খাচ্ছো না!"
তুলতুল মায়ের লাল চোখ দেখে গাল ফুলিয়ে মাথা নুইয়ে রেখেই বললো,
“ সবসময় শুধু ঘরের খাবার খাই, একদিনও কি বাইরের কিছু খেতে ইচ্ছে করে না।ভাইয়াকে বললাম ভাইয়া বলছে যাবে না,তাইফকেও যেতে দিবে না বলছে।"
আফিয়া বুঝলো মেয়ের মনোভাব,মেয়েটা তো বাইরে খুব একটা যেতে পারে না। পড়াশোনার জন্য যতটুকু যায় ততটুকু সময় পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকে, অন্যদিকে তাকাবে কিভাবে? আফিয়া আর বকাঝকা করলো না, ক্ষান্ত কন্ঠে বললো,
“ রাত হয়েছে, কাউকে বাইরে যেতে হবে না।বাবা চলে আসবে কিছু সময়ের মধ্যেই,বাবাকে ফোন করে বলে দাও যা খেতে চাও,বল যেন নিয়ে আসে।"
সে নিজের কাজে চলে গেলো। বুদ্ধিটা ঠিকঠাক, তুলতুল হাত বাড়িয়ে দিলো বড় ভাইয়ের দিকে ,বললো,
" বাবাকে ফোন দিবো!"
নাইফ ফোন বের করে বোনের হাতে দিয়ে ঘাড় হেলিয়ে দিলো হেডে। বুবুন বাবাকে ফোন দিচ্ছে কথাটা বুঝতেই তুহি সোফা থেকে গড়িয়ে নামলো,হাত দুটো একসাথে উপরে তুলে বোনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“ বাবা কতা বলবো! আমি বলবো!"
সে এরমধ্যেই ফোঁস ফোঁস আওয়াজ তুলে জেদ করা শুরু করে দিয়েছে।নাইফ তুলতুলকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“ ওকে দে না।ঐ ই বলুক। একজন বললেই তো হয়!"
তুলতুলও দ্বিমত ছাড়াই ফোনটা দিলো, এদিকে তাইফ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে,এসেই সে লাফ দিয়ে ধপ ধরনের একটা আওয়াজ সৃষ্টি করে সোফায় আগের মতো হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো।নাইফ এক পলক সেদিকে দেখলো অতঃপর মনোযোগ দিলো ছোট বোনের দিকে।তুহি নিজের ছোট ছোট দুই হাতে মুঠোফোনটা চেপে ধরেছে,গালের সাথে ,সে সোজা হয়ে বসে বোনকে টেনে এনে নিজের পাশে বসিয়ে দিলো,তুলতুলও এসে পাশে বসলো।
তিন রিং হতেই অপরপাশ থেকে ফোনটা গ্রহন করা হলো, খুবই নমনীয় গলায় বললো,
“ আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ!"
নাসিফ সাহেবের এত সুন্দর সালামের উত্তরে বলা হলো,
“ বাবা বাবা বাবা বাবা বাবা মজা নিয়ে আছো! তুয়ি মজা খাবো!"
নাসিফ হাতের ফাইলের উপর কলমটা ঠেকিয়ে রেখেই মেয়ের কথা শুনছে।তুহি আগের মতোই একটানে বাবাকে ডাকছে,
“ বাবা বাবা বাবা বাবা তুয়ি মজা খাবো,বুবুন মজা খাবো ভাইয়া মজা খাবো আর..."
থেমে গেছে,কি বলবে হয়তো বুঝতে পারছে না। কিন্তু এর এই সিরিয়াল ধরে মজা খাবোতে নাসিফ কি করে বুঝবে সে আসলে কি খাবে?নাসিফ জিজ্ঞেস করলো,
“ কি মজা খাবেন আপনি আম্মা!"
“ না মজা খাবো!"
নাসিফ হাসলো শিশু কন্যার অবুঝপনায়,বোকা উত্তরে। নাইফ পাশ থেকে তুহির কানে কানে বলে শিখিয়ে দিলো,,
“ বাবাকে বলো তুমি চাপ তন্দুর রুটি খাবে।"
তুহি বড় বড় চোখ করে ভাইয়ের কথা শুনলো,নাসিফ নিরব হয়ে মেয়ের কথা শুনছে,তুহি বললো,
“ তুয়ি তাপ তুদুর খাবে!"
বোনের বলার ভঙ্গিতে হাসলো নাইফ, ঠোঁট টিপে ডান মুষ্টি মুখের উপর রেখে।নাসিফ বুঝলো না কিন্তু অনুমান করার চেষ্টা করছে।তাইফ এগিয়ে এসে তুহির পায়ের কাছে বসল, এরপর সেও কানে কানে বলার চেষ্টা করলো,
“তুহি বাবাকে বলো আমি নাগেটস খাবো,না না না বলো শাহী মোগলাই!"
তুহি এটাও শুনলো বড় বড় চোখে চেয়ে,সে যেন সবার কথাই বুঝতে পারছে,সে নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করলো এবারও,
“ বাবা তুয়ি মজা খাবো,আর তুয়ি...."
এতটুকু বলে থামলো। ছোট ভাইয়ার পানে চেয়ে নিলো মিনিট এক এরপর বললো,
“ তুয়ি নাগ আর মুলাই খাবো!"
ওর নাম বিকৃতি করা দেখে তাইফ নিজের কপালে চাপড় মারলো। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে উঠে পড়লো, চু জাতীয় শব্দ করে বললো,
“ এভাবে বললে বাবা কিছুই বুঝবে না।"
সে কথা শেষ করেই আবার আগের জায়গায় গিয়ে আগের মতো করেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে পড়লো।ভাইদের কান্ডে বিরক্ত হয়ে তুলতুল বললো,
“ আশ্চর্য,খাবো তো আমি। তাহলে তোমরা কেন বলছো!"
নাইফ তাইফ ভ্রু কুঁচকে নিলো,তেতানো গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ কেন সব কি তোমার একার জন্য আনে?"
“ আমি বাবাকে আমার একার জন্যেই আনতে বলবো।তোমাকে আনতে বলেছিলাম না,আনোনি কেন?"
নাইফ ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল,তুলতুল বোনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ছোট করে বুঝিয়ে বললো,
“ তুমি বাবাকে বলো বাবা আমি ফুচকা খাবো!"
তুহি তাই করলো, বোনের মুখের দিকে চোখ রেখেই বললো,
“ বাবা বাবা বাবা,তুয়ি ফুককা খাবো।তুয়ি মজা খাবো,বুবুন ফুককা খাবো,ভাইয়া তাপ খাবো,ছুথ ভাইয়া নাগ মুলাই খাবো।বাবা বাবা বাবা তুমি তাতায়ি আসো,তুয়ি ক্ষুধা লাগে,তুয়ি মজা খাবো!"
শেষ বাক্যে ভীষণ অসহায়ত্ব ছিলো।সে সবার হয়ে বাবাকে অর্ডার দিলো।নাসিফ এত সময় চার ছেলে মেয়ের কথাই শুনেছে তাই সে সবই বুঝতে পারছে।সে মুচকি হাসছে তার চার সন্তানের কান্ডে। তারাও বাবাকে বলতে পারে কিন্তু বলাবে বোনকে দিয়েই যেন আবদার কোনটাই বাতিল না হয়।
নাসিফের আস্তে আস্তে সাড়ে নয়টা বেজে গেলো। দরজায় বেল বাজতেই চার সৈন্য দাঁড়িয়ে পড়লো,তুহি ছুটে দরজার সামনে দাঁড়ালো,তাইফ গিয়ে দরজা খুলে দিলো।
“ বাবা বাবা বাবা বাবা!"
তুহি ফোকলা হেঁসে ডাকতে ডাকতে বাবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এদিকে তাইফ হাত বাড়িয়ে বাবার হাতে থাকা ঠোঙ্গাগুলো নিলো,নাসিফ দরজায় পা দিতেই ই নাইফ,তুলতুল,তাইফ বাবাকে সালাম দিলো,নাসিফ সালামের উত্তর দিতে দিতেই তুহিকে কোলে তুলে নিলো, গালে কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বললো,
“ আম্মা আপনি বাবার অপেক্ষা করছিলেন?"
“ হুম,আম..আম..আমি নিভো।আমাকে দাও।"
“ এগুলো গরম আম্মা,ভাইয়া নিক।আপনি পারবেন না!"
“ আমি নিভো আআআআ হাহ্!"
তুহি জেদ চেপে চিৎকার করছে,নাসিফ মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে ছেলেকে আদেশ করলো,
“ দাও বোনের হাতে দাও। তুমি পাশে থেকে দেখে রাখো তাহলেই হবে।"
ততক্ষণে তুহি বাবার কোলে তুলে গড়িয়ে নেমে দাঁড়িয়েছে,ভাইয়ের থেকে নিয়ে পেটের সাথে চেপে ধরে হেলতে দুলতে টেবিলের সামনে দাঁড়ানো মায়ের কাছে গিয়ে বাড়িয়ে দিলো,আফিয়া হেসে মেয়েকে আদর দিয়ে বললো,
“ বুবুনকে দাও।"
ফুচকা মোগলাই আর চাপ, তন্দুর রুটি,সবার ফরমায়েশের সব নিয়ে আসছে সবার জন্য। রাতের খাবার হিসেবে এগুলোই খাবে।তা দেখে আফিয়া ভীষণ ছিটছে।সে এত কষ্ট করে এত রান্না করেছে এখন কি-না বাচ্চারা এগুলো খাবে?
সব খাবার পাশে রেখে ফুচকা একটা প্লেটে নিয়ে তুলতুল খাবার টেবিলে বসেছে।তুহি টেবিলের উপর বসা,তুলতুল একটা শুকনা ফুচকা বানিয়ে তুহির মুখে দিলো। এদিকে তুলতুল টক পানিতে চুবিয়ে চুবিয়ে ফুচকা মুখে দেওয়ায় তার চোখ মুখ বুজে যায়।তুহি আগ্রহ ভরা বড় বড় চোখে তা দেখে , অতঃপর....
নাইফ,তাইফকে এক প্লেটে দিয়েছে,তাইফ নাইফের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একসঙ্গে দু'টো মুখে ঢুকাচ্ছে,নাইফ যেখানে খুব ধীরস্থির ভাবে মুখ ঢুকিয়ে অনিচ্ছুক হয়ে চিবুচ্ছে সেখানে তাইফ একটা মুখে ঢুকিয়ে অন্যটা ঠোঁটের সামনে চেপে ধরে আগেরটা একটু নরম হতেই এইটাও পুরে ফেলে।তা দেখে নাইফ মাথায় গাট্টা মারলো,বললো,
“ আস্তে খা না,গলায় আটকাবে তো!"
বলতে বলতেই তাইফ খুকখুক করে কেশে দিলো।
সত্যিই গলায় আটকেছে, নাইফ তড়িঘড়ি করে পানির গ্লাসে পানি ঢেলে দিলো, ততক্ষণে তাইফের অবস্থা কাহিল।মাথায় উঠে যাওয়ার মতো।তুলতুল খাওয়া বাদ দিয়ে ভাইয়ের দিকে এগিয়ে পিঠে চাপড় মারতে আরম্ভ করলো,তালুতে ম্যাসাজ করতে থাকলো, মিনিট এক পর তাইফ শান্ত হলো, কিন্তু তাইফ কি শান্ত থাকার মানুষ?
সে স্বাভাবিক চট করেই উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো, চেঁচিয়ে বলতে আরম্ভ করলো,
“ তুমি মারলা ক্যান? তোমার জন্যই তো এইটা হইছে!"
“ আমি কখন মারলাম তোরে? তুই নাকেমুখে খেলে মাথায় উঠবে না?"
“ দেখছো তুমি আমি নাকেমুখে খাইছি, সবসময় খালি মারবো!"
ঠোঁট চোখা করে ছোট গোলগোল করে নাক ফুলিয়ে ফোঁস ফোঁস আওয়াজ করছে।নাসিফ লুঙ্গির গিট দিতে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে এদিকে আসছে,গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ আবার কি হলো?"
তাইফ বাবাকে দেখতে পেয়ে গলার জোর আরো বাড়ালো , ফুঁপিয়ে বললো,
“ তোমার সাথে খাবো না আমি।আমি আলাদা খাবো!"
“ এ্যাই যা এইখান থেকে নয়তো.."
“ কি হচ্ছে কি এখানে? খেতে বসেও তোমাদের এগুলো কি?"
“ আফিয়াও পাশে দাঁড়িয়ে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ আবার কি নিয়ে লেগেছে তোমাদের দুই ভাইয়ের? বুঝলাম না সারাদিন লেগে থাকো কেন তোমরা?"
নাসিফ গাঁয়ে অর্ধেক এঁটে রাখা সাদা পাতলা গেঞ্জিটা নামিয়ে ঠিকঠাক করে পরে নিলো এরপর তাঁতানো গলায় বড় ছেলের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
“ কি নিয়ে সারাক্ষণ ছোট ভাইবোনদের সাথে খিটখিট করো তুমি?"
নাইফ ক্রুধিত চোখে তাইফের দিকে এক পলক চেয়েই বললো,
“ আমার কোন সমস্যা নাই, সমস্যা সব আপনার ছেলের!"
“ ও আমার ছেলে তুমি কি?"
নাইফ ভোঁতা মুখে আবারও বললো,
“ আপনার ছোট ছেলে সব বিষয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে!"
“ আমি কিছুই করিনি। তুমি শুধু শুধু আমার মাথায় থাপ্পড় মারছো!"
ছোট ছেলের সাফাই দেওয়া বাক্য শুনে নাসিফ বড় ছেলের দিকে লাল চোখে তাকালো, রাগান্বিত গলায় বললো,
“ তোমাকে না আগেও বলেছি ওর মাথায় মারবে না? তোমাকে বলছি না ওর মাথায় এমনিতেই সমস্যা আছে; তাহলে..."
“ মাথায় মারছি আমি তোকে? মিথ্যাবাদী!
_ আপনার ছেলেকে মাদ্রাসায় না পাঠিয়ে থানায় পাঠানো উচিত, মিথ্যা বলার শাস্তি হিসেবে!"
নাসিফ আগের মতোই কঠোর লাল চোখ করে চেয়ে আছে, নাইফ নিজের কথা শেষ করে আবার বললো,
“ আপনার ছেলে একসঙ্গে দু'টো ফুচকা মুখে ঢুকিয়েছে,তাহলে গলায় আটকাবে না তো কি হবে? খেতে বসলে এভাবে খায় যেন জীবনেও ঐটা খেতে পায়নি, কেউ ওর থেকে নিয়ে যাবে তাই ওকে ওভাবে খেতেই হবে।
কোন ম্যানার্স নেই,সব বিষয়ে গোঁয়ার্তুমি করে!"
“ শিখছে কার থেকে? তোমার থেকেই তো! তোমারই তো ভাই! তুমি যা করবে ওরা তাই করবে! এই যে কথায় কথায় তুমি ওদের গাঁয়ে হাত তুলো,তাই ওরাও ছোট জনের গায়ে হাত তুলে। তুমি চেঁচামেচি করো,ওরাও তাই করে।
শোন কাউকে ভালো কিছু শেখাতে হলে আগে নিজেকে সেই ভালো রপ্ত করতে হয়, তুমি যা করবে তোমাকে অনুসরণ করা মানুষও তাই করবে।এই জন্যই তো বলে আগের হাল যেদিকে যায় পিছনেরটাও সেদিকে যায়। নিজের হাত মুখ সামলাও, ছোট ছোট ভাই বোনের সামনে এভাবে আসামির ন্যায় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের মানসম্মান খুইয়ে বসো না। ভবিষ্যতে পাত্তা পাবে না।"
“ হয়েছে আসেন তো,ওরা ভাই বোনরা নিজেদেরটা নিজেরাই বুঝে নিবে। আমরা নিজেদের কাজ করি!"
“ হ্যাঁ বোঝার নমুনা তো এই'ই ! সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে তান্ডব,এক সেকেন্ডও মতের মিল নেই।যেন গৃহযুদ্ধ চলছে অবিরত!"
আফিয়া স্বামীকে ঠেলে ঘরের দিকে পাঠিয়ে দিলো, মেয়ের উদ্দেশ্য করে বললো,
“ ভাইদের খাবার আলাদা করে দাও। দু'জনকে একসঙ্গে কেন দিয়েছো?"
“ খাবো না আমি!"
বলেই নাইফ সোফায় গিয়ে বসলো চোখমুখ কালো করে,তাইফ সেই প্লেটটা টেনে নিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসলো।এত কিছুর মাঝে নিরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে ছিলো দুই বোন।তুলতুল আরেকটা বাটিতে করে সব নিয়ে বড় ভাইয়ের দিকে নিয়ে এগিয়ে দিতেই নাইফ চোখ রাঙানি দিলো!
তুলতুল তা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বললো,
“ না খেলে তোমারই লস,আমার কি!"
“ ফেলে দিবো কিন্তু!"
“ দাও গিয়ে,তাও তো আম্মুকে বলতে পারবে না আমি তোমাকে সাধিনি,নইলে তো পরে আবার আমাকে আম্মু বকবে তার ছেলেকে না দেওয়ার জন্য!"
“ এখন কিন্তু তুই মার খাবি!"
“ তারপর তুমি বাবার হাতে খাবে।
একসঙ্গে দুইবার!"
বলেই তুলতুল দুই আঙ্গুল উঁচিয়ে ভি শো করে জিহ্বা বের ঠোঁট ভেটকি মারলো।নাইফ শুধু দেখলো। একজনের জন্য একটু আগেই ঝাড় খেয়েছে,এখন এটাকে দুইটা দিলে আজকে ঘরে তুলকালাম বেঁধে যাবে।দেখা গেলো তা গিয়ে বাবা মায়ের ঝগড়ায় রূপ নিবে।তাই নাইফ চোখ রাঙানো ছাড়া কিছুই করতে পারলো না। দাঁত কামড়ে,নাক কুঁচকে তাকিয়ে থাকলো।তুহি নিরব দর্শক থেকে বেরিয়ে অকাজ করে ফেললো,সে হাত ঢুকিয়ে দিলো ফুচকার টকে।বড় বোনের দেখাদেখি সেও মুখে ঢুকিয়ে দিলো টকে ভেজা ফুচকা, অতঃপর...
চোখমুখে কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠলো, কারণ টকের সঙ্গে সঙ্গে ফুচকার পানি তো ঝালও লাগে। তাকে তো তার বোন মরিচ বেছে বেছে এতক্ষণ খাইয়েছে।
হাত পা ঝাড়ছে আর চেঁচাচ্ছে, ঠোঁট বেয়ে লালা ঝড়ছে,তিধ ভাই-বোনই সচকিত হয়ে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
“ কি হয়েছে তুহি?"
ঘর থেকে নাসিফ, আফিয়া,রুকাইয়াহ,সুফিয়াও বেরিয়ে আসলো রান্না ঘর থেকে।নাইফ বোনকে কোলে নিয়ে থামানোর চেষ্টা করছে, বারবার জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে? চোখমুখ তার ভীতসন্ত্রস্ত! তুলতুল বোঝার চেষ্টা করছে কি হয়েছিল,তাইফ হাত দিয়ে বোনের হাত মুছছে আর বলছে,
“ আ্ আ্ তুহি বুড়ি সাহসী বাবু, কাঁদে না।ব্যথা পাইছো তুমি?"
“ কি হয়েছে কি আমার কাছে দাও!"
বোম্বাই মরিচ দিয়ে বানানো টক পানি,দুধের মুখে পড়েছে। নিশ্চয়ই ভীষণ জ্বালা করছে! ঠোঁট ঝড়তে থাকা লালায় গলা,বুক ভিজছে,নাসিফ মেয়ের ঠোট গড়িয়ে পড়া ফুচকার গলিত অংশ দেখেই বললো,
“ ওকে কি ফুচকা মুখে দিয়েছো!"
তুলতুল ভীত চোখে বাবার দিকে চেয়ে নিচু গলায় বললো,
“ দিয়েছি তো কিন্তু ওকে তো মরিচ বেছে বেছে দিচ্ছি বাবা,পানিও দেইনি।"
“ কি বলছো?"
“ টক খাইছে নাকি?"
আফিয়া স্বামীর কোল থেকে মেয়েকে নিয়ে নিজের ওড়নার কোনা দিয়ে গাল,জিহ্ব মুছে দিচ্ছে।রুকাইয়াহ দৌড়ে গিয়ে চিনির বয়াম এনে আফিয়ার সামনে ধরে বললো,
“ চিনি খাওয়ান ভাবী।"
“ মধু আনো!"
সুফিয়া দৌড়ে গিয়ে মধু এনে দিলো,আফিয়া আঙ্গুলের মাথায় মধু লাগিয়ে মেয়ের পুরো মুখে ঘষে দিলো,তুহি চেঁচাতে চেঁচাতেই যতটুকু লালা আর থুতুর সাথে মিশে স্বাদে লাগলো তাতেই সে থেমে গেলো।জিহ্বা চাটতে থাকলো।একটু থামার পর ছলছল চোখে চেয়ে রইল বোনের দিকে।তুলতুল বোনের হাত ধরে বললো,
“ তোমাকে তো আমি মরিচ দেইনি,তাও তোমার ঝাল লেগেছে বনু?"
ভরা চোখে চেয়ে আছে তুহি,আফিয়া বললো,
“ তুমি না দিলেও হয়তো একটু লেগেছিল তাতেই এমন করেছে।যাক ঠিক হয়ে গিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ,তোমরা খাও গিয়ে!"
“ ওকে আর দিও না।তোমরাই খাও।"
বলে নাসিফ মেয়েদের দিকে একপলক চেয়ে ভেতরে চলে গেলো,নাযির আহমাদ কিছু সময় আগেই এখানে এসে দাঁড়িয়েছেন,তিনি বউমার উদ্দেশ্য করে বললো,
“ ওকে এখানে রেখো না মা, তোমার বড় বাচ্চাদের খেতেও দিবে না কিন্তু।"
বাবা চলে গেছে,দাদু,দাদীও,তুহি এবার চোখ বুজতেই তার চোখ থেকে গড়িয়ে পানি পড়লো,সে মুখ ফিরিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়ানো বড় ভাইয়ের দিকে চাইলো,হাত দুটো সেদিকে বাড়িয়ে দিলো।নাইফ মুচকি হেসে বোনকে নিলো।আফিয়াও বড় ছেলের কাছে মেয়েকে ছেঁড়ে দিয়ে আবারও চারজনকে সতর্ক করে দিলো যেন কোন শব্দ না আসে। সারাদিন পর একজন মানুষ ঘরে আসে,তাকে একটু বিশ্রাম দিতে।
তুহি ভাইয়ের কোলে বসে টেবিলে থাকা ফুচকার টক পানি দেখছে,নাইফ বোনের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঐটা দেখে ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বললো,
“ তুমি ঐটা খেয়েছো!"
“ মজা!"
তার মজার অর্থ বড় তিন ভাই বোন বুঝে নিলো।তাইফ কপালে চাপড় মারলো। বিরবির করে উচ্চারণ করলো,
“ হায়রে!"
তুলতুল বড় ভাইয়ের রোষ থেকে নিজেকে উদ্ধার করতে বললো,
“ আমি দেইনি।"
“ আমি জানি।"
বলেই নাইফ ছোট বোনকে নিয়ে আবারও টেবিলে বসলো,শুকনা ফুচকার মধ্যে মধু মাখিয়ে তুহির মুখে দিলো,সে তা মুখে নিয়ে এক কামড় দিয়েই বের করে ফেললো।লালা সহ অর্ধ গলিত ফুচকাটা বড় বোনের মুখের সামনে ধরলো,
“ ইয়াক,আমি খাবো না। তুমি খাও। ফেলো না।"
বোনের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় সে তা বড় ভাইয়ের দিকে ঘুরিয়ে ধরলো,নাইফ সেটা দেখে মুচকি হাসলো, ছোট্ট হাতটা এগিয়ে নিয়ে তার কব্জি ধরে সেই হাত দিয়েই ঐ ফুচকাটা মুখে নিলো। ছোট হাতের তালুটা জিহ্ব দিয়ে ভালো করে চেটে নিলো যেন মধু কোথাও লেগে না থাকে।তুহি নিজের পিচ্চি পিচ্চি দাঁত বের করে হাসলো।
আজকের জন্য খতম,আবার আসবো অন্য কোন সারপ্রাইজ পর্ব নিয়ে।
প্রাত্যহিক দৃশ্য, তাদের বড় কালের কিন্তু দেখিয়েছি অথচ এখন মনে হচ্ছে ছোট বেলায়ও তাদের কিছু কিছু থাকতে পারতো।যা তাদের বড় কালকে আরো বেশি প্রাণবন্ত করতে পারে।
এসব কাহিনী ঘরঘরকার। সবার জীবনের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।এটাকে আমি সাহিত্য বলবো না, সাধারণ রোজনামচা বলা যেতে পারে।
আচ্ছা জানাইয়েন কেমন লাগলো?






0 মন্তব্যসমূহ